সয়াবিন তেলের আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে

রেফায়েত উল্লাহ মীরধা
রেফায়েত উল্লাহ মীরধা
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশ কম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় না করায় তারা আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

তারা বলেন, বর্তমান ও আগের অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ জানানো হলেও দাম সমন্বয় করা হয়নি। লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

এদিকে সরকার বলছে যে আমদানির পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং এই মুহূর্তে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, পাম তেল আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন, যা এ বছরের একই সময়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৭ হাজার টনে।

তবে, এই সময়ে সয়াবিন তেলের আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে; আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন থেকে কমে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

সম্প্রতি বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কিছু এলাকায় ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এর প্রাপ্যতাও সংকুচিত হয়ে আসছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল আমদানি কমে যাওয়ার জন্য দাম সমন্বয় না করার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন।

তিনি জানান, গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দাম সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল; কিন্তু তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি দাবি করেন, পুরো শিল্প খাত এখন লোকসানের মধ্য দিয়ে চলছে এবং কোনো কোম্পানিই টানা লোকসান সইতে রাজি নয়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেল ১ হাজার ১৫৪ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম বেড়ে ১ হাজার ২৮২ ডলারে এবং মার্চে তা আরও বেড়ে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে দাঁড়ায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, এই খাত চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ায় কোম্পানিগুলোর পক্ষে স্বাভাবিক মজুত বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও দাবি করেন, সয়াবিন তেলের মাত্র একটি চালান আমদানিতেই ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু কার্যক্রম সচল রাখা, সরবরাহ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং ব্যাংকের দায় মেটানোর জন্য কোম্পানিগুলো সীমিত সরবরাহ বজায় রাখছে। ডিলাররাও সামান্য লাভে উচ্চ মাসিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গঠিত ১১তম টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমদানির জন্য বড় অংকের পুঁজির প্রয়োজন হয় এবং সেই পর্যায়ের মূলধন কেবল বড় ব্যবসায়ীদেরই রয়েছে। তাই আমরা নিত্যপণ্যের আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।

সয়াবিন তেলের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের সংগৃহীত তথ্য বলছে যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে দাম লেখা থাকায় এতে কোনো ধরনের কারসাজি করার সুযোগ থাকে না।

তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ ‘কিছুটা সীমিত’।

তিনি আরও স্বীকার করেন, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল ‘পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া গেলেও’ তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা নিত্যপণ্যের বর্তমান দাম এবং আমদানির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মূল্যায়ন বলছে যে আমদানির অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। অন্য কথায়, এমন কোনো বড় সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি যার জন্য বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।’