পীরগঞ্জ: শুধু ঘরই নয়, জালও নিয়ে গেছে জ্বালিয়ে দিয়েছে
রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ার জেলেদের ডাকছে আখিরা নদী, বড়বিলা বিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার পর মাছ ধরার জাল নেই তাদের কাছে। ১৭ অক্টোবর রাতের হামলায় অধিকাংশ জেলের জাল পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। প্রায় ৫০-৬০টি জেলে বাড়ি থেকে লুট করে নিয়ে গেছে মাছ ধরার নানারকমের জাল। তাই আর মাছ ধরতে যেতে পারছেন না তারা।
৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আখিরা নদীর উৎপত্তি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায়। পরে এটি গাইবান্ধা জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ হয়েছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায়। নদীটি পীরগঞ্জে এসে ১৪০০ একরের একটি প্রাকৃতিক বিলে প্রবেশ করেছে। আকার-আয়তনে বড় হওয়ায় এই বিলের নাম হয়েছে বড়বিলা। পরে নদীটি বড় করিমপুর (মাঝিপাড়া) গ্রামের কাছে এসে আবার দিনাজপুরের দিকে চলে গেছে।
আখিরা নদী আর বড়বিলাকে ঘিরেই ছিল মাঝিপাড়ার ১৪০ জেলের জীবন। ওই হামলার পর এখন পুরো পাড়া জুড়ে সুনসান নীরবতা। অনেকের বাড়িতে লুট না হলেও ভয়ে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হামলার আগে যে বিল জেলেদের আনাগোনায় মুখরিত থাকতো, সেই দৃশ্য এখন আর নেই।
মাঝিপাড়ার বাসিন্দা পুষ্প রানী (৩০) দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, হামলাকারীরা তাদের ৩টি মাছ ধরার জাল পুড়িয়ে দিয়েছে এবং ২টি জাল লুট করে নিয়ে গেছে।
'ওই জালগুলোই ছিল আমাদের জীবিকার মাধ্যম', বলেন তিনি।
গ্রামের আরেক জেলে ধলু দাস (৩৮) বলেন, 'হামলাকারীরা আমার বাড়িতে আগুন দেয়নি। কিন্তু তারা আমার ৩টি টানা জালসহ বাড়ির সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। জীবিকা নির্বাহে জাল ছিল আমার একমাত্র সম্পদ।'
মাঝিপাড়া গ্রামের আরেক জেলে নিবাস চন্দ্র দাস (২৫) বলেন, 'আমি স্থানীয় মৎস্য অফিস থেকে মাছ ধরার জাল পেয়েছি। কিন্তু ভয়ে এখনও নদীতে যেতে পারছি না।'
যদিও দক্ষিণ মাঝিপাড়ায় হামলার আগে আক্রমণকারীরা জমা হয়েছিল উত্তর মাঝিপাড়ায়। সেখানেও কিছু হিন্দু বাড়িতে তারা লুটপাট করে। তাই উত্তর জেলেপাড়ার প্রায় ৮০টি পরিবার এখনও ভয় আর শঙ্কায় বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না।
উত্তর মাঝিপাড়ার নৃপেন্দ্রনাথ (৪০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর ও জেলে। তাদের জীবিকার মাধ্যম মাছ শিকার। দিনমজুর যেদিন কোনো কাজ পায় না, সেদিন বড়বিলাতে গিয়ে মাছ ধরলেও তার দিন চলে।'
'যেদিন থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ হলো, সেদিন থেকে বেশিরভাগ মানুষ ভয়ে বাড়ির বাইরে যায় না, বাড়িতেই থাকে। এভাবে কাটতে থাকলে তো আমাদের না খেয়ে মরতে হবে', বলেন নৃপেন।
জেলেরা জানান, যাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন। জাল কেনার পর্যাপ্ত টাকাও তারা পেয়েছেন। কিন্তু ভয়ে এখন গ্রাম থেকে বের হতে পারছেন না।
জানতে চাইলে পীরগঞ্জ উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা এখন পর্যন্ত ২৬টি জেলে পরিবারের কথা জানি, হামলায় যাদের জাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।'
'আখিরা নদী ও বড়বিলায় মাছ ধরে এখানকার ১০০টিরও বেশি পরিবার জীবিকা নির্বাহ করতো। শত শত বছর ধরে মাছ ধরাই তাদের উপার্জনের একমাত্র উপায়। সারাদিন মাছ ধরে তারা বটেরহাট বাজার ও পীরগঞ্জ সদরে গিয়ে সেগুলো বিক্রি করতেন। এই জেলেদের কাছ থেকেই উপজেলার বাসিন্দারা দেশি মাছ পেয়ে থাকেন', বলেন তিনি।
এই মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, 'জেলা মৎস্য অফিসের তহবিল থেকে আমরা ১৫টি পরিবারকে ১৫টি মাছ ধরার জাল দিয়েছি। কিন্তু এখনও সরকারের কাছ থেকে কোনো ত্রাণ ও নগদ টাকা পাইনি।'
'আমাদের হাতে সহায়তা হিসেবে কিছু এলে, আমরা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করব', যোগ করেন তিনি।