প্রত্যাবাসনের প্রবল উৎসাহের মূল্য দিয়েছেন মুহিব উল্লাহ

মোহাম্মদ আল-মাসুম মোল্লা ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাত

হত্যাকাণ্ডের শিকার রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহর সংগঠন প্রায় ৪ মাস আগে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সুবিধার্থে প্রতিটি আশ্রয় ক্যাম্পে প্রত্যাবাসন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল।

রোহিঙ্গাদের কেন দেশে ফিরে যেতে হবে- সে ব্যাপারে তাদের সচেতন করতে এই কমিটিগুলো তৈরি করেছিল মুহিবের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস।

এই উদ্যোগটি ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন গ্রুপকে। এসব গ্রুপ মনে করে, কেবল আরাকান রাজ্য স্বাধীন হলেই তাদের ফিরে যাওয়া উচিত।

গত বুধবার রাতে নিহত মুহিবের একজন ঘনিষ্ট সহচর বলেন, 'কমিটি গঠনের পরপরই মুহিব হুমকি পেতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি তার সংকল্পে অটল ছিলেন।'

মুহিব ও তার অনুসারীরা কেবল লাম্বাসিয়া ক্যাম্পেই অনেকগুলো কমিটি গঠন করেছিলেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ক্যাম্পেও কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংস দমন-পীড়ন থেকে বাঁচার জন্য সেখান থেকে পালিয়ে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই আশ্রিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের পক্ষে মুহিব ছিলেন অগ্রণী কণ্ঠ।

২০১৯ সালে মুহিবের নেতৃত্বে একটি দল কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর একটি বড় সমাবেশের আয়োজন করে। কার‌্যত এই প্রচেষ্টাই মুহিবকে ব্যাপক স্বীকৃতি এনে দেয়।

ওই বছরের শেষে মুহিব জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউজে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ পান। হোয়াইট হাউজে তিনি ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন।

মুহিবের অনুসারীদের মতে, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তারা আরও বলেন, মুহিব সম্প্রতি মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি সরকারবিরোধী গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এই কর্মকাণ্ডও ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে।

এর আগে মুহিবের স্ত্রী নাসিমা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, বুধবার রাতে গুলিতে নিহত হওয়ার কয়েক মিনিট আগেও তিনি তার সংগঠনের কয়েকজন অনুসারীর সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কথা বলেছিলেন।

তার ভাই আহমেদ উল্লাহ বলেন, শুক্রবার হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে মিয়ানমার জাতীয় ঐক্য সরকারের একাধিক নেতার সঙ্গে মুহিবের আলাপ করার কথা ছিল।

কুতুপালংয়ে ৭ নম্বর ক্যাম্পের ৬০ বছর বয়সী বাসিন্দা মোহাম্মদ সুলতান জানান, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি জনপ্রিয় করার জন্য তার ক্যাম্পেও কমিটি গঠনের কথা ছিল।

মুহিবের মৃত্যুতে শোকাহত এই ব্যক্তি বলেন, 'মুহিব ছিলেন একজন আশাবাদী মানুষ। তিনি সব সময় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কথা বলতেন। আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দুঃখজনক বিষয় হলো, মিয়ানমার থেকে অনেক দূরে তাকে এখানেই কবর দিতে হয়েছে।'

ডেইলি স্টারের এই দুই প্রতিবেদক গতকাল কুতুপালং ও লাম্বাসিয়া ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের বেশিরভাগই নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ওই বাসিন্দাদের বক্তব্য, ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থেই মুহিবকে হত্যাকারী বন্দুকধারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি এর মাধ্যমে অপরাধীদের এই বার্তা দেওয়া হবে যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

মুহিবের মৃত্যুতে শঙ্কিত ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আজিজ খানের প্রশ্ন, 'ক্যাম্পে খারাপ মানুষ আছে। তার (মুহিব) মতো একজন বড় মাপের মানুষ যদি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?'

আজিজ খানের মতে, ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা বলেন, 'এখন মুহিবের বাসায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যদি এটা আগেই করা হতো, তাহলে তাকে মরতে হতো না।'

তিনি বলেন, অপরাধীরা ক্যাম্পের সবখানেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, পুলিশ শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে লাম্বাসিয়া ক্যাম্প থেকে আব্দুস সালাম (৩০) ও কুতুপালং ক্যাম্প থেকে জিয়াউর রহমান (৩২) নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওইদিন সকালে আরেক রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অনুবাদ করেছেন মামুনুর রশীদ