‘মরে যাওয়ার আগে খুনিদের শাস্তি দেখতে চাই’
প্রতিবছর ২১ আগস্ট এলে গ্রেনেড হামলার সেই নিষ্ঠুর আর বীভৎস মৃত্যুর দৃশ্যে ডুকরে কেঁদে ওঠেন হামলায় সন্তান হারানো হাসিনা বেগম। ৭৬ বছর বয়সী এই মা বলেন, 'আর সহ্য করতে পারি না, বুকের মধ্যে ধরফর করে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। জীবনের শেষ সময়ে এসে একটাই চাওয়া সন্তানের খুনিদের শাস্তি দেখে মরতে চাই।'
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াল সেই হামলায় নিহত ২৪ জনের মধ্যে হাসিনা বেগম ও হারুন অর রশীদের ছেলে মাহবুবুর রশীদও নিহত হন। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ছিলেন বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স করপোরাল কুষ্টিয়ার খোকসার জয়ন্তী হাজরা ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামের মাহবুব।
৮৫ বছর বয়সী মাহবুবের বাবা হারুন অর রশীদ জানান, বছরের এই দিনে বাড়িতে অনেক লোক সমাগম হয়। স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা আসেন। মাহবুবের কবর জিয়ারত করেন। আসেন সাংবাদিকরা তারা সাক্ষাৎকার নেন।
'আমি একটি কথাই শুধু বলি হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে এতো দেরি কেন?
তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে সন্তানের হত্যাকারীদের শাস্তি দেখে যেতে না পারলে মনে আক্ষেপ থেকে যাবে।
সন্তান হারানো এই বৃদ্ধ পিতা মাঝে মাঝে রায় বাস্তবায়নের আশার আলোও দেখেন। কিন্তু হঠাৎই সবকিছু চুপ হয়ে যাওয়া দেখে হতাশ তিনি।
জানান, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ১০ সন্তানের লেখাপড়া করিয়েছেন। মাহবুবকে বাড়ির পাশের ফুলবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান তিনি। সেখান থেকে মাহবুব পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা না থাকায় তাকে তার মামা আবদুর রব নিয়ে গিয়ে রাজবাড়ীর পাংশার বাহাদুরপুর শহীদ খবির উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। মামাবাড়ি থেকেই ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাস করেন মাহবুব। তারপর সংসারের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীর মেজর পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বাসায় ৬০০ টাকা বেতনে চাকরি নেন মাহবুব। পরে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পান।
মাহবুবের চাকরির সুবাদেই দরিদ্র সংসারটি কিছুটা স্বাচ্ছন্দের মুখ দেখে। নির্দিষ্ট মেয়াদে চাকরি শেষে গ্রামে ফিরে ব্যবসার উদ্যোগ নেন।
২০০০ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ড্রাইভার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন মাহবুব। পরে বিশ্বস্ততা ও সততা অর্জন করায় অল্প সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দায়িত্ব পান মাহবুব।
সন্তানের সততা, সংগ্রামী মনোভাব, মানুষের প্রতি দায়িত্বের নিষ্ঠায় ভীষণ গর্বিত মাহবুবের মা হাসিনা বেগম। বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যাকে রক্ষা করতে জীবন উৎসর্গ করেছে আমার ছেলে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তাদের দ্রুত শাস্তি হোক।
বলেন, 'মাহবুবের স্ত্রী ও দুই নাতি নিয়মিত খোঁজ রাখেন তাদের। নাতি আশিক ও রবিনকে নিয়েও স্বপ্ন দেখি। তারা বড় হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে-এই প্রত্যাশা।'