সিআইডির ২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক বিশেষ সুপারিন্টেনডেন্ট ও উপ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীকে অন্তত তিন দিন সিআইডি সদর দপ্তরে আটকে রেখে টাকা দাবি করার এবং হত্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ইয়াকুব আলী নামের ৪৬ বছর বয়সী ওই ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) এই অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে ইয়াকুব উল্লেখ করেছেন, হত্যা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা দোলন মজুমদারের দাবি করা ১০ লাখ টাকা দিতে অস্বীকার করায়, তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাকে নির্যাতন ও মামলার ঝামেলা থেকে বাঁচাতে তার পরিবার বাধ্য হয়েছে দোলনকে দুই লাখ টাকা দিতে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ইয়াকুবের অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন দোলন। তিনি বলেন, মামলায় ইয়াকুবের নাম এসেছিল এক সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে।
কিন্তু, যে সাক্ষী ওই জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তিনি পরে আদালতে হলফনামা জমা দিয়ে বলেছেন, জবানবন্দির জন্য তাকে এবং তার ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের চার সদস্যকে তিন দিন সিআইডি সদর দপ্তরে আটকে রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি ইয়াকুবের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অভিযোগে ইয়াকুব উল্লেখ করেন, দোলন ও সিআইডির বিশেষ সুপার (ঢাকা উত্তর) খালিদুল হক হাওলাদার তাকে ওই মামলায় ফাঁসিয়েছেন। গত ১ জুন মামলাটিতে গ্রেপ্তার দেখানোর পর তিনি দেড় মাস কারাগারে ছিলেন। ২৮ জুলাই জামিন পাওয়ার পর, গত ১১ আগস্ট ইয়াকুব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) অভিযোগ দায়ের করেন এবং এর অনুলিপি ও প্রাসঙ্গিক নথি স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং সিআইডি সদর দপ্তরে পাঠান।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ জুন সিআইডির একটি দল ইয়াকুবকে আটক করে। এরপর তাকে ৬০ ঘণ্টা সিআইডি সদর দপ্তরে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। গত ১৩ জুন তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানায় সিআইডি। আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ইয়াকুব বলেন, 'নির্যাতনের ফলে ১২ জুন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। তারা আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।'
'এসআই দোলন আমার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। আমাকে নির্যাতন ও ঝামেলা থেকে বাঁচাতে আমার ভাই পরে তাকে দুই লাখ টাকা দেন', অভিযোগ করেন তিনি।
ইয়াকুবের অভিযোগের পর সম্প্রতি সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিটকে এ মামলার তদন্ত ভার দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুসারে, গত বছরের ২০ জুন খায়রুল ইসলাম নামের ২০ বছরের এক তরুণ রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় এক মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। একটি ভবনের তৃতীয় তলা থেকে পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওইদিন মারা যান তিনি। এ ঘটনায় গত বছরের ১ জুলাই বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন খায়রুলের বাবা আব্দুল কুদ্দুস শিকদার।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ওই মেয়ের সঙ্গে খায়রুলের পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু, মেয়েটির বাবা এ সম্পর্ক মেনে নেননি। ঘটনার দিন খায়রুল যখন মেয়ের বাসায় যান, তখন মেয়েটির বাবাসহ চার থেকে পাঁচ জন অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তি তাকে মারধর করেন। পরে তারা খায়রুলকে পাশের একটি বাড়ির টিনের চালে ফেলে দেন। সেখানেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান খায়রুল।
তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খায়রুলের মৃত্যু হয়েছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। গত বছরের ২৩ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ফরেনসিক মেডিসিনের প্রধান সোহেল মাহমুদ ওই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে খায়রুলের শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইয়াকুব অভিযোগ করে বলেন, 'সিআইডি কর্মকর্তারা এখন বলছেন, আমি নাকি কেরোসিন নিয়ে মেয়েটির বাবাকে দিয়েছিলাম এবং তিনি খায়রুলের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ১০ জুন আমাকে সিআইডি সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার পর তারা বলেন, ঘটনার দিন মেয়ের বাবা মোবাইল ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে কেরোসিন নিতে বলেছিলেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি তাদের বলেছি যে, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। মেয়ের বাবার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু, তারা আমাকে হাতকড়া পরিয়ে, চোখ বেঁধে অন্য ঘরে নিয়ে যান। সেখানে তারা আমার ওপর নির্যাতন চালান।'
মেয়ের বাবার সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথার কোনো কল রেকর্ড সিআইডি দেখাতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন ইয়াকুব।
এ ছাড়া, গত বছরের ২৭ জুলাই দেওয়া জবানবন্দিতে মেয়েটিও ওই ঘটনায় ইয়াকুবের কোনো সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেননি। খায়রুল নিচে পড়ে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন বলেই জানান তিনি।
তবে, ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর গত ১২ জুন মেয়েটির মা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে বলেন, ঘটনার দিন খায়রুল তার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তার স্বামী খায়রুলকে মারধর করেন। এরপর তিনি তার বন্ধু ইয়াকুবকে ফোন করে কেরোসিন আনতে বলেন এবং পরে তা খায়রুলের গায়ে ঢেলে দেন। জীবন বাঁচাতে খায়রুল ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন।
কিন্তু, গত ২৭ জুন ওই মেয়ে এবং তার মা মহানগর হাকিম আদালতে পৃথক হলফনামা জমা দিয়ে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তাদের দুজনসহ তাদের পরিবারের আরও তিন সদস্যকে গত ১০ জুন সিআইডি সদর দপ্তরে যেতে বলেন। তারা সেখানে যাওয়ার পর সিআইডি কর্মকর্তারা তাদের তিন দিন আটকে রাখেন। মেয়েটির মাকে ইয়াকুবের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন তারা।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলার সময় অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই দোলন বলেন, 'এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মেয়ের মায়ের দেওয়া জবানবন্দিতে ইয়াকুবের নাম ওঠে আসে। আমরা কাউকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে বাধ্য করিনি।'
দ্য ডেইলি স্টার খালিদুল হক হাওলাদারের অফিস ও ব্যক্তিগত নম্বরে অন্তত ২৫ বার ফোন করে এবং বক্তব্যের জন্য ম্যাসেজ পাঠায়। কিন্তু, তিনি এতে সাড়া দেননি।
যোগাযোগ করা হলে সিআইডির অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক শেখ ওমর ফারুক বলেন, ইয়াকুবের নাম তদন্তের পর ওঠে এসেছে।
তিনি বলেন, 'সিআইডি তদন্ত করে বের করেছে যে, ঘটনার দিন ইয়াকুব কেরোসিন এনেছিলেন এবং মেয়ের বাবাকে দিয়েছিলেন। আমরা এখন মেয়েটির বাবাকে খুঁজছি। তিনি পলাতক।'
অভিযোগের বিষয়ে ফারুক বলেন, 'অভিযুক্তরা অভিযোগ থেকে বাঁচতে বিভিন্ন অভিযোগ আনতে পারে। যেহেতু, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।'
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক (ডিসিপ্লিন) রেজাউল হক বলেন, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগটি মনে করতে পারছেন না। এ বিষয়ে মন্তব্য করার আগে তাকে সংশ্লিষ্ট নথি দেখতে হবে।
অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম