এডিবির অর্থায়নে প্রকল্প: অর্ধ-বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জিত হয়নি
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের অর্ধ-বার্ষিক চুক্তি লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৭ শতাংশ এবং অর্থ ছাড় লক্ষ্যমাত্রার ৪৭ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে। মহামারির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কতটা ধীর হয়ে পড়েছে, এর মাধ্যমে তা বোঝা যায়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণদাতাদের অন্যতম এডিবির একটি নথি অনুসারে, ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের চুক্তি ও অর্থ ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৮২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও এক হাজার ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ম্যানিলাভিত্তিক বহুপাক্ষিক ঋণদাতা ব্যাংকটি বলছে, করোনা মহামারির কারণে তাদের বেশিরভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চুক্তি ও অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সব প্রকল্প টিমকে পরবর্তী ছয় মাসে এসব চুক্তি ও অর্থ ছাড় অবস্থার উন্নয়নের জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে নথিতে।
এ বিষয়ে আজ সোমবার একটি ত্রিপক্ষীয় পোর্টফোলিও পর্যালোচনা সভা (টিপিআরএম) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। চলতি বছরের চুক্তি ও অর্থ ছাড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে বাস্তবসম্মত একটি পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ছিল এ সভায়। এ ছাড়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে করোনা পরিস্থিতির প্রভাব আলোচনা এবং গত মার্চে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ টিপিআরএম সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি পর্যালোচনারও কথা ছিল।
কিন্তু, গতকাল রোববার সভাটি আগামী মাস পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
চলমান প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন, সেগুলোও এ সভায় আলোচনা করার কথা ছিল।
বর্তমানে এডিবির ১২ দশমিক তিন ডলার বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের মাধ্যমে দেশের ছয়টি খাতে ৫২টি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ১২টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ১১টি, বিদ্যুৎ খাতে নয়টি, পানি, নগর অবকাঠামো ও সেবা খাতে নয়টি, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ছয়টি এবং অর্থনৈতিক খাতে পাঁচটি প্রকল্প চলমান।
মহামারির কারণে প্রকল্পের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত
করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার গত বছরের মার্চ থেকে সারাদেশে বিধি-নিষেধ ঘোষণা করে। প্রায় সব প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ দুই মাসেরও বেশি সময়ের জন্যে বন্ধ হয়ে যায় তখন।
ওই বছরের জুনে এডিবি জানায়, তারা যে ৪৯টি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে, তার মধ্যে অন্তত ৪০টির বাস্তবায়ন কাজ মহামারির কারণে ধীরগতিতে চলছে।
এ গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গত বছরের জুলাইয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা, ঠিকাদার ও পরামর্শদাতাদের ব্যবহারের জন্যে কোভিড-১৯ স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা প্রটোকল সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা প্রস্তুত করে এডিবি। পরে গত মার্চের টিপিআরএম সভায় মেয়াদসহ ১৪১ দফার একটি কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে একমত হন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১৫ জুন পর্যন্ত ওই কর্মপরিকল্পনার ৬১ শতাংশ কাজ নির্দিষ্ট মেয়াদে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। আরও নয় শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে নির্দিষ্ট মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে। বাকি ১৬ শতাংশ বাস্তবায়িতই হয়নি।
এর মধ্যে সরকারের মহামারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় ছাড়া সব মন্ত্রণালয়কে জুন পর্যন্ত কোনো মাঠ পর্যায়ের কার্যাদেশ না দেওয়ার আহ্বান জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ আরও জটিলতায় পড়ে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন খাত
১৯টি ঋণ ও একটি অনুদানের মাধ্যমে এডিবি বর্তমানে পরিবহন খাতের ১২টি প্রকল্পে মোট দুই দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করছে। এটি পুরো দেশের ২৮ শতাংশ এবং একক খাতে সর্বোচ্চ অর্থায়ন।
এ ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) পাঁচটি, বাংলাদেশ রেলওয়ে পাঁচটি, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি একটি এবং সওজ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি বাস্তবায়ন করছে।
এ খাতের চুক্তি ও অর্থ ছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ১৬৯ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ৩৫৭ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও, ১৫ জুন পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ১৬১ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এডিবির মতে, এসব প্রকল্পের আটটি ‘ঠিক পথে আছে’, তিনটির ‘মনোযোগ’ প্রয়োজন এবং একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’।
‘মনোযোগ’ প্রয়োজন এমন তিনটি প্রকল্পের একটি হচ্ছে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প। এর আওতায় ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত একটি বিশেষায়িত বাস লাইন নির্মিত হচ্ছে। সওজ, সেতু কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করছে।
চার হাজার ২৬৮ দশমিক ৩৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় কয়েক দফায় সংশোধিত হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধিত মেয়াদ ২০২২ সালের জুনে শেষ হবে। কিন্তু, ওই সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে এডিবি যে প্রকল্পটির কথা উল্লেখ করেছে, সেটি হচ্ছে রেলওয়ে রোলিং স্টক কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্প।
রেলওয়ের নথির তথ্য বলছে, তিন হাজার ৬০২ দশমিক সাত কোটির এ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে অনুমোদন পায়। চলতি বছরের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র আট শতাংশ।
এডিবির অর্থায়নে অন্য যেসব প্রকল্পের কাজ চলছে সেগুলো হলো—সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প, সাসেক ঢাকা উত্তর-পশ্চিম করিডোর সড়ক প্রকল্প, সাসেক রেল সংযোগ প্রকল্প: আখাউড়া-লাকসাম ডাবল ট্র্যাক ও সাসেক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলওয়ে প্রকল্প।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
যোগাযোগ করা হলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর জানান, মহামারির মধ্যে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে গেলেও, পুরোদমে কাজ করতে পারেননি তারা। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর নিলামে বিভিন্ন দেশের ঠিকাদাররা অংশ নেন। আর এক্ষেত্রে তাদের শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হয়।
‘তাই, কোভিড পরিস্থিতির জন্যে আমাদের ক্রয়ের কাজ বিলম্বিত হয়ে যায়’, গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।
পাশাপাশি, মহামারির মধ্যে ক্রয়ের অনুমোদন পেতেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে বলে জানান তিনি।
আবদুস সবুর বলেন, ‘চুক্তি বা অর্থ ছাড়ের দুরাবস্থার জন্যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থাকে দোষ দিতে পারবেন না। পুরো প্রক্রিয়াটাকেই দোষ দিতে হবে আপনাকে।’
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, ‘মহামারির কারণে যে রেলওয়ের প্রকল্পগুলোর ওপর প্রভাব পড়েছে, তা সত্য। কিন্তু, কতটা প্রভাব পড়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে বলা সম্ভব নয়।’
তবে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে ভালো কাজ করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন জারীন তাসনিম