যথাসময়ে শস্য উৎপাদনের তথ্য জানাতে পারছে না পরিসংখ্যান ব্যুরো
কৃষকরা খেত থেকে আলু ও গম সংগ্রহের পরে প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় পরেও কেউ যদি উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ এবং সর্বশেষ ফলনে প্রতি একরে কী পরিমাণ শস্য উৎপাদিত হয়েছে তার পরিমাণ জানতে চান, তাহলে তাকে হতাশ হতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।
উদাহরণ হিসেবে বোরো ধানের কথা বলা যায়। দেশে ধানের বার্ষিক উৎপাদনের ৫৫ শতাংশই বোরো জাতের। বিবিএসের শস্য পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী, কৃষকরা মে ও জুন মাসে বোরো ধান কেটে গোলায় তুলেছেন। আড়াই মাস পার হয়েছে এবং উৎপাদিত শস্যের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছেও গেছে। কৃষকরাও জুলাই-আগস্টে আউশ ধান কেটেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিবিএস জানায়, বোরো ধান উৎপাদনের তথ্য প্রস্তুত আছে কিন্তু সেটি পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এ ধরনের দেরি নতুন কিছু নয়। বিবিএস শস্য উৎপাদনের অনুমিত সংখ্যা প্রকাশ করতে বেশ কয়েক মাস সময় নেয়।
শস্য কেনা, আমদানি, মজুদ ও বাজারে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরিকল্পনা করার জন্য সময়মতো এ তথ্য হাতে পাওয়া খুবই জরুরি। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বাজারে শস্যের মূল্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, 'উৎপাদন ও চাহিদা সংক্রান্ত নির্ভুল তথ্য সময়মতো আমাদের হাতে আসা খুবই জরুরি। এই তথ্যের অনুপস্থিতিতে শস্য কেয়, আমদানি ও বিতরণের পরিকল্পনা তৈরি করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অনুমানের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করতে হয়। যেটি সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।'
বিবিএসের ওয়েবসাইটে এক বছর আগে উৎপাদিত পাটের বিস্তারিত তথ্য, যেমন: সামগ্রিক ও একর প্রতি উৎপাদনের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। এরপর আর শস্য উৎপাদন সংক্রান্ত নতুন কোনো তথ্য সেখানে সংযুক্ত করা হয়নি। সময়মতো তথ্য না পাওয়ার কারণে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের (ডিএই) তৈরি করা 'ক্রপ ডেটা' এখন তথ্যের মূল উৎস। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিএইর অনুমিত সংখ্যাগুলো বিবিএসের তথ্য প্রকাশের পর সংশোধন করে কমিয়ে আনতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ডিএই গত অর্থবছরে বোরো ধান উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছিল ২ কোটি টন, যেটি বিবিএসের তথ্য প্রকাশের পর কমিয়ে ১ দশমিক ৯৬ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে।
ততদিনে কৃষি মন্ত্রণালয় বাম্পার ফলনের দাবি করে কিন্তু তা সত্ত্বেও চালের দাম বেড়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে আমদানির সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা গেছে, গত এপ্রিলে দেশে চালের দাম সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল। বিবিএস জানিয়েছে, তারা শস্য কাটার ২ মাসের মধ্যে উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করার লক্ষ্যে কাজ করছে কিন্তু বাস্তবে এই তথ্য প্রকাশ হতে আরও অনেক বেশি সময় লাগে।
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, বোরো ধান উৎপাদনের প্রতিবেদন প্রস্তুত আছে এবং তারা পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানান, তথ্য সংগ্রহ, বিন্যাস ও যাচাই করতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। যেহেতু এই কাজগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে করা হয়, এতে অনেক সময় লেগে যায়।
বিবিএস কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রধান শস্যগুলোর তথ্য দ্রুত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। বিবিএস ধান ও অন্যান্য শস্য উৎপাদনের তথ্য দেশের ৬৪টি জেলা থেকেই সংগ্রহ করে। প্রতিটি উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন থেকে ৫ জন করে কৃষক নির্বাচন করে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের পর সেটি জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা পর্যায়ে তথ্যগুলোকে বিন্যস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তথ্যগুলোকে যাচাই করে তারপর তা বিবিএসের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। বিবিএস শস্য সংক্রান্ত তথ্যের চূড়ান্ত বিন্যাস ও যাচাই শেষে তা পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠায়।
বিবিএসের একজন কর্মকর্তা জানান, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা মাঠ পর্যায়ে তথ্যের ভুল সংশোধন প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে তথ্য সংগ্রহ বিঘ্নিত হয়। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন অঞ্চলে শস্য কাটার সময় ভিন্ন হওয়ায় তথ্য সংগ্রহের সময়সীমাও ভিন্ন হয়।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, শস্য উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য এত সময় নেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় এবং এতে নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব পড়ছে।
'মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পর কীভাবে সেটিকে বিশ্লেষণ করা যায়, সে ব্যাপারে সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আমি ইতোমধ্যে বিবিএসকে অনুরোধ জানিয়েছি। যদি তারা শিগগির তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তির সহায়তা নিতে চায়, সে ক্ষেত্রে আমি সেটির অনুমোদন দেবো', বলেন এম এ মান্নান।
তাজুল ইসলাম জানান, বিবিএস ধান ও অন্যান্য শস্যের তথ্য বিশ্লেষণের জন্য দুটি আলাদা সফটওয়্যার ব্যবহার করবে।
'এতে তাৎক্ষণিকভাবে শস্য উৎপাদনের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সহায়তা পাব', বলেন তাজুল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক তথ্য খুবই জরুরি। তিনি আরও বলেন, 'তাৎক্ষণিক তথ্যের অনুপস্থিতিতে নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে কর্মপরিকল্পনার সিদ্ধান্তে দুর্বলতা দেখা দেয়।'
তিনি জানান, বর্ধনশীল আয়ের প্রেক্ষাপটে শস্যের চাহিদা বাড়ছে এবং উৎপাদন, মজুদ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক তথ্য কৃষক, ব্যবসায়ী ও সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ মোয়াজ্জেম মূল খাদ্যশস্যগুলোর তথ্য সময়মতো সংগ্রহ ও প্রকাশের সমাধান খুঁজে বের করতে কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, 'একই সময়ে চালসহ অন্যান্য মূল খাদ্যশস্যের জাতীয় চাহিদা নতুন করে অনুমান করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।'
তিনি শস্য কাটার ১৫ দিন পর থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল যন্ত্রের সহায়তা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
চট্টগ্রামভিত্তিক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী জানান, অনেক দেশে শস্য উৎপাদনের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য একাধিক সমীক্ষা পরিচালনা করা হয় এবং সঠিক পরিকল্পনা তৈরির জন্য আমদানি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়। তিনি বলেন, 'সময়মতো এবং নিয়মিতভাবে তথ্য প্রকাশ করা হলে তা চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে থাকা ব্যবধান দূর করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয় এবং বাজার স্থিতিশীল থাকে।'
বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কাজী শাহাবুদ্দীন ভুল পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ তাৎক্ষণিক তথ্যের চেয়ে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের ওপর বেশি জোর দেন। তিনি নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তের জন্য বিবিএসের অন্তর্বর্তীকালীন তথ্য ব্যবহারের সুপারিশ করেন, কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এটি খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না।
বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামানও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদের (বিএআরসি) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়াইস কবির জানান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় কৃষি সংস্থাগুলোকে শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস তৈরির কাজ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ডিএইকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।'
প্রতিবেদনটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক