প্রথায় পরিণত হওয়া বাল্যবিয়ে রোধে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ৩ প্রস্তাব
ফাতেমা আখতার (১৩) সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঈদুল আজহার চারদিন আগে ৬ জুলাই তার বিয়ে হয়। পড়াশুনা করার ইচ্ছা ছিল ফাতেমার। কিন্তু বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সাহস ছিল না তার। তাই বাধ্য হয়েই বিয়েতে সম্মতি দেয় ফাতেমা।
ফাতেমার বড় ৩ বোন- আঞ্জুনা খাতুন, অঞ্জনা আখতার ও বুলবুলি আখতারের বিয়েও হয়েছে অল্প বয়সে। তার নিজের বিয়ের দিনেই বিয়ে হয়েছে তার বান্ধবী আঁখিতারা খাতুনেরও। তাদের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দুর্গম 'হকের চর' এলাকায়।
কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও গঙ্গা নদীর ৩ শতাধিক চর এলাকায় বাল্যবিয়ে অনেকটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় সাধারণত ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। বাল্যবিয়ে রোধে সরকারি-বেসরকারি প্রচারণা এমনকি আইন প্রয়োগেও কোনো সুফল মিলছে না।
এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে হকের চর, গুজিমারি চর, সাহেবের আলগার চর ও হাতিয়ার চর এলাকার অন্তত ২০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার। এসব পরিবারের সদস্যরা বাল্যবিয়ে রোধে ৩টি প্রস্তাব রেখেছেন। তাদের ধারণা, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাল্যবিয়ে রোধ করা যাবে।
তাদের প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে আছে- চরাঞ্চলের নারী শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা করা, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চরাঞ্চল থেকে মূল ভূখণ্ডে এসে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য নারী শিক্ষার্থীদের বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা।
বাল্যবিয়ের শিকার ফাতেমা আখতারের ভাষ্য, চরে কোন হাইস্কুল নেই। অনেক কষ্ট করে দূরে গিয়ে পড়াশুনা করতে হয়েছে এতদিন। তার ইচ্ছা ছিল এসএসসি পাস করার। কিন্তু বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সাহস হয়নি তার।
ফাতেমার বাবা আজিদ মিয়া (৪৮) বক্তব্য, 'অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে যৌতুক কম লাগে। খুব সহজে পাত্র পাওয়া যায়। এছাড়া টাকা পয়সা খরচ করে মেয়ের পড়াশোনা করিয়েও কোনো লাভ হয় না। মেয়ে বড় হলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটারও আশংকা থাকে।'
ফাতেমার মা জরিনা খাতুন এ ব্যাপারে বলেন, 'মাইয়াটা ডাঙ্গর হইছে। এ্যাহোন যদি কোন বিপদ ঘইটা যায় ক্যাডা এইডা দেখবো। মাইয়ার বিয়া দিয়া নিশ্চিন্তে আছি।'
বাল্যবিয়ের আরেক শিকার ফাতেমার বান্ধবী আঁখিতারা খাতুনের উপলব্ধি হলো, 'এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার চেয়ে স্বামীর সংসার করাই ভালো। কারণ চরে তো কোন হাইস্কুল নাই।'
নিরাপত্তাহীনতা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর তার অনেক বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করে আঁখিতারা।
আঁখিতারার বাবা আলিম উদ্দিনের ভাষ্য, সরকার যদি চরবাসীর প্রস্তাবনাগুলো আমলে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করে তাহলে চরাঞ্চলের বাল্যবিয়ের এই ধারা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, 'আমরা আশা করব সরকার আমাদের প্রস্তাবনাগুলো ভেবে দেখবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।'
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়ার সঙ্গে। এই জনপ্রতিনিধি বলেন, 'চরের বেশিরভাগ বিয়ের নিবন্ধন হয় না। এটি একটি প্রথায় পরিনত হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না। চরের বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা ও চিন্তাশক্তি জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত এটি চলতে থাকবে।'
এসব কারণে উল্লিখিত প্রস্তাবনাগুলোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার কত, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে ব্র্যাক ৬ হাজার ৩০০টি পরিবারের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপে কোনো পরিবারে কোনো বিয়ে হলে তা কত বছর বয়সে হয়েছে—সেটি পরিবারগুলোকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে হয়েছে। আর ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এসব নারীর বয়স ছিল ১৬ বছরের নিচে।
এ ছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, করোনা মহামারির ভেতর স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পাশাপাশি বাল্যবিয়ের হারও অনেকটা বেড়েছে।