র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার সব দায় সরকারকে নিতে হবে: ফখরুল

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

র‌্যাবের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা তা এক অর্থে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেই নিষেধাজ্ঞার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, বিএনপি মনে করে র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সব দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করার সব দায়িত্ব তাদেরই।

আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

লিখিত বক্তব্য পাঠ করে ফখরুল বলেন, আপনারা সবাই অবগত আছেন সম্প্রতি 'গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের' অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক নির্বাহী আদেশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ র‌্যাবের ৬ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর আর্থিক ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশের বিশেষায়িত একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রধানতম বন্ধুপ্রতীম অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক কৌশলগত অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত বিব্রতকর ও উদ্ধেগজনক। তবে তা ছিল নিঃসন্দেহে অবশ্যম্ভাবী।

ফখরুল বলেন, গত ১ দশক ধরে বিএনপিসহ বাংলাদেশের প্রায় সব গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন ও ভয়াবহ নির্যাতনের বিষয়ে দেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বের নানা আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাপকভাবে আলোচিত। মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞার ফলে সমগ্র জনগণের মাথা যখন বিশ্ববাসীর কাছে হেঁট হয়ে আছে সেই মুহূর্তে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় এক বৃদ্ধকে আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। যদিও পুলিশ বলছে, তিনি লক আপের ভেতর 'আত্মহত্যা' করেছেন। তবে পরিবারের দাবি, তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

এ রকম পরিস্থিতি লাগাতারভাবে জনগণের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনকারী বর্তমান অবৈধ সরকারের মন্ত্রীরা র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগকে 'কাল্পনিক অভিযোগ' বলে উড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি এ ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মুল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার গতানুগতিক অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মন্তব্য, বিবৃতি দেখে মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করে এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অথচ প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেই এ সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন সম্পর্কে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথারীতি তা প্রত্যাখান করে এ ধরনের অপরাধকে অধিক হারে উৎসাহিত করা হয়, বলেন তিনি।

বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, রূঢ় শোনালেও এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, 'গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের' অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা বর্তমান চলমান গণ ও মানবতাবিরোধী সরকারের জন্য সমগ্র বিশ্ববাসীর পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী বার্তা—কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের বিচারহীন সংস্কৃতি চলতে পারে না। বিএনপি মনে করে র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সব দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করার সব দায়িত্ব তাদেরই। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত 'সামিট ফর ডেমোক্রেসি' বা গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানোর মধ্যে দিয়ে তা আরও সুস্পষ্ট হয়।

র‌্যাবের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা তা এক অর্থে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেই নিষেধাজ্ঞার শামিল। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রহীন সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য র‌্যাবকে বিভিন্ন আইন বিরোধী সংস্কৃতির অংশ হতে বাধ্য করেছে। অতএব, কার্যত রাজনৈতিক সরকারগুলো দায় বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান দেওয়া যাবে না। তবে যারা ইতিমধ্যেই সরকারের এ ধরনের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেদেরকে অংশীদারি পরিণত করে নানা ধরনের বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতি চালু করতে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফখরুল আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সামনে এটা একটা জাতীয় সমস্যা। আর জাতীয় সমস্যা জাতীয়ভাবে সবাইকে নিয়ে সমাধান করতে হয়। আর সেটা তখন কেবল তখনই সম্ভব, যখন দেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে। কারণ, গণতন্ত্রবিহীন সমাজে জবাবদিহিতা প্রতিটি পদে পদে বিঘ্নিত হয়, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান। মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কখোনোই সুনিশ্চিত থাকে না। বাংলাদেশের ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী মাদার অব ডেমোক্রেসি খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় বিদেশ প্রেরণে সরকারের প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি তার সর্বশেষ উদাহরণ।

তিনি বলেন, দেশে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজনের পথ পরিষ্কার করে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক ব্যবস্থা করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করে দেশে মানবাধিকার ও বিচার পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পালনকালে এটাই হতে পারে সমগ্র দেশ বাসীর জন্য সর্বোত্তম প্রাপ্তি।