পূর্ব জুরাইনে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু: দায় সিটি করপোরেশনের, বলছেন স্থানীয়রা

শাহনেওয়াজ খান চন্দন

পূর্ব জুরাইনের খাজা মাহবুব আলী সড়কের বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা হাফিজা ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। তার ১২ বছর বয়সী ছেলেও মশাবাহিত এই রোগটিতে আক্রান্ত হয়। তার ছেলে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ১৩ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছে।

হাফিজা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নিজেও অসুস্থ থাকায় ছেলের যত্ন নিতে পারিনি। ডাক্তার আমাদের দুইজনকেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুজনই ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য না থাকায় আমরা শুধু ছেলেকে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। খাবারে অরুচি থাকায় সে এখনও ভীষণ দুর্বল।'

তিনি আরও বলেন, 'গত বছর আমার মেয়ের টাইফয়েড হয়েছিল। ২০১৯ সালে আমার মা আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আমি আমার স্বামীকে অনুরোধ করেছি অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া নিতে, কিন্তু অন্য এলাকায় ভাড়া বেশি। সেই সামর্থ্য আমাদের নেই।'

হাফিজাদের বাড়ির সামনের ভবনটি ফাঁকা পড়ে আছে। হাফিজার স্বামী মো. সুলতানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে এই ভবনের দুই জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এবং প্রায় প্রতিটি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় সবাই পর্যায়ক্রমে এ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

সুলতান বলেন, 'মৃতদের একজন ছিল ১০ বছর বয়সী জিশান। জিশানের বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়।'

পূর্ব জুরাইনের স্থায়ী বাসিন্দা ও একজন সমাজ কর্মী মো. মিজানুর রহমান বলেন, 'এ রাস্তা ধরে এগোলে একটি বাড়িও পাওয়া যাবে না যেখানে অন্তত একজন ডেঙ্গু রোগী নেই। অনেকেই ইতোমধ্যে চলে গেছেন। বাকিরাও মহল্লা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কারণ রোগটি এখানে দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'যারা এখন এখানে থাকছেন, তারা স্থায়ী বাসিন্দা অথবা তাদের এরচেয়ে ভালো কোনো এলাকায় থাকার সামর্থ্য নেই।'

স্থানীয়দের মতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৩ নং ওয়ার্ডের আওতাধীন পূর্ব জুরাইনের বেশিরভাগ বাসাতেই কারও না কারও ডেঙ্গু হয়েছে।

এই প্রতিবেদক পূর্ব জুরাইনের খাজা মাহবুব আলী সড়ক, কমিশনার সড়ক, নুরানী মসজিদ সড়ক এবং সবুজবাগ ও খালপুর এলাকার অন্তত ২০টি বাড়ি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং সবগুলো বাড়িতেই কমপক্ষে একজন করে ডেঙ্গু রোগী খুঁজে পেয়েছেন।

ওয়ার্ডে কতজন ডেঙ্গু রোগী আছেন এবং কয়জন মারা গেছেন, সে ব্যাপারে কোন তথ্য ডিএসসিসির কাছে নেই। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় এ সংবাদদাতা শুধুমাত্র আগস্টেই অন্তত নয় জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে পারেন।

একটি নিয়মিত ঘটনা

পূর্ব জুরাইনে প্রতিবছর ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগ ছড়ানো একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

যেকোনো মানুষ এই এলাকা ঘুরে দেখলেই এখানে রোগ ছড়ানোর নেপথ্যের কারণগুলো জেনে যাবেন। বয়সের ভারে জর্জরিত ও জরাজীর্ণ নর্দমা থেকে বের হয়ে আসা ময়লা পানির সঙ্গে আবর্জনা উপচে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় ময়লা পানি জমে আছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব জুরাইনে জলাবদ্ধতার বাড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তার উচ্চতা বাড়ানো।

যেহেতু এটি একটি নিচু এলাকা, সিটি করপোরেশন প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেখানে রাস্তাগুলোকে উঁচু করছে, কিন্তু তারা এ কাজটি করার সময় রাস্তার ধারের বাড়িগুলোর উচ্চতাকে বিবেচনায় নেয়নি।

গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন গলি ১০ ফুট পর্যন্ত উঁচু করা হয়েছে, যেমন নুরানী মসজিদ সড়ক ও কমিশনারের সড়ক।

ফলশ্রুতিতে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাড়ির এখন রাস্তার তুলনায় অনেক নিচে চলে গেছে এবং এ কারণে বৃষ্টিতে খুব সহজেই বাড়িগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

ডিএসসিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই রাস্তাগুলোকে অদূর ভবিষ্যতে আরও পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফেরদৌস বলেন, 'ডিএসসিসি অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা উঁচু করার কারণে পূর্ব জুরাইনের বেশিরভাগ বাড়ির প্রথম দুই তলা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।'

তিনি আরও জানান, প্রতিবার বৃষ্টি হওয়ার পর রাস্তা থেকে পানি গড়িয়ে এসে দালানের প্রথম দুই তলায় জমা হতে থাকে এবং দিনের পর দিন ধরে এই জলাবদ্ধতা বিরাজ করে, কারণ এই বিপুল পরিমাণ পানি সরানোর কোনো উপায় নেই। জমে থাকা পানিতে লাখ লাখ মশা জন্ম নেয়।

বারবার রাস্তা উঁচু করার কারণে অনেক বাড়িওয়ালা তাদের বাড়ি পরিত্যক্ত রেখে চলে গেছেন।

এই পরিত্যক্ত ভবনগুলোর ভেতরে পানি জমে থাকে এবং সেই পানির ওপর অসংখ্য মশা ভাসতে দেখা যায়।

'আমরা প্রায়ই বালু ও মাটি দিয়ে আটকে থাকা পানি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু নিজ খরচে এই উদ্যোগ কতক্ষণ চালানো যায়? এই মহল্লার বেশিরভাগ মানুষই অত্যন্ত দরিদ্র', জানান ফেরদৌস।

তার অভিযোগ, 'ডিএসসিসির কর্মীরা মশা মারার জন্য এখানে আসেন না বললেই চলে। তারা সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার করার কোন উদ্যোগও নেন না।'

কর্তৃপক্ষ যা বলছে

৫৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মীর হোসেন মীরুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মশা দমনে ডিএসসিসির উদ্যোগ যথেষ্ঠ নয়।

তিনি উল্লেখ করেন, 'উপকরণের স্বল্পতার কারণে ডিএসসিসির কর্মীরা মহল্লার সব জায়গা নিয়মিত পরিদর্শন করতে পারেন না। এ কারণে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছি, যাতে মানুষ নিজেই উদ্যোগী হয়ে আশপাশ পরিষ্কার রাখে।'

সড়কের অপরিকল্পিত উন্নয়নের ব্যাপারে কাউন্সিলর জানান, 'আমি রাস্তার উচ্চতা বাড়ানোর অপরিকল্পিত উদ্যোগকে সমর্থন করি না। অনেকেই সড়ক উঁচু হওয়ার কারণে তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আয়ের উৎসগুলো হারিয়েছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির পেছনে এটিও অন্যতম কারণ।'

তবে ডিএসসিসি উদাসীনতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অবৈধ স্থাপনা তৈরি ও পরিবেশ দূষণকে দায়ী করেছে।

ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'আমাদের কর্মীরা নিয়মিত সকল ওয়ার্ডে সরেজমিনে মশা ধ্বংস করার জন্য যায় এবং তারা একই সঙ্গে মশার সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্রগুলোকেও ধ্বংস করে।'

নাসের আরও বলেন, 'আমরা স্থানীয়দের অনুরোধ করেছি একটি হটলাইন নাম্বারে, মেসেঞ্জার চ্যাট ও আমাদের ওয়েবসাইটে থাকা একটি সরল ফর্ম পূর্ণ করার মাধ্যমে মশার প্রজননক্ষেত্র সম্পর্কে আমাদেরকে জানাতে। যখনই আমরা মশার প্রজননক্ষেত্র সম্পর্কে তথ্য পাই, তখনই আমাদের দল সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নেয়।'

জুরাইনে কেন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সে ব্যাপারে নাসের জানান, 'আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে যে তালিকাটি পাই, তাতে সব সময় রোগীদের ঠিকানা থাকে না। তাই আমাদের দল সবগুলো ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করতে যেতে পারে না। আবারও বলছি, জুরাইনে এমন কিছু হাসপাতাল আছে, যেখানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা করা হচ্ছে, কিন্তু তারা সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানাচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে, আমরা জুরাইনে ডেঙ্গু রোগীদের প্রকৃত সংখ্যাটি জানতে পারছি না।'

'এছাড়াও জুরাইনের বাসিন্দারা ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার জন্য যে ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার দরকার, সে ব্যাপারে সচেতন নন। তারা সুয়ারেজে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলেন, যেটি পুরো সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে আটকে দেয় এবং ফলশ্রুতিতে রাস্তায় ময়লা পানি ছড়িয়ে পড়ে।

আবু নাসের জানান, 'তবে আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে জুরাইনের বাসিন্দারা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। এ সমস্যাগুলো দূর করার উদ্দেশ্যে আমরা একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছি, যার মাধ্যমে সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা হবে এবং পুরো শহরকে নতুন করে সাজানো হবে। এ বিষয়ে আমরা খুব শিগগির কাজ শুরু করব।'