যেভাবে গ্রেপ্তার হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন

তৌসিফ কাইয়ুম ও এমরুল হাসান বাপ্পী

রাজধানীর ধানমন্ডিতে চাচাতো ভাইয়ের বাসা থেকে মঙ্গলবার ভোরে গ্রেপ্তার হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। গ্রেপ্তারের কয়েক-ঘণ্টা আগে তিনি ধানমন্ডির ৮/এ সড়কের ওই বাসায় পৌঁছান।

বাসাটি ছিল শিরীন শারমিনের চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আরিফ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তার সঙ্গে (শিরীন শারমিন) দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ সোমবার তিনি ফোন করে বলেন বাসায় আসবেন। তার পছন্দের খাবার রাখার কথাও বলেন।'

'সোমবার সন্ধ্যায় তিনি (শিরীন) ও তার স্বামী ছোট একটি লাগেজ নিয়ে বাসায় আসেন। লাগেজ দেখে আমি বেশ খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে তাদের হয়তো কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে পাব। আমরা একসঙ্গে রাতের খাবারও খেলাম, গল্প করছিলাম,' বলেন তিনি।

তবে তাদের গল্পের স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ ছিল না। মাঝরাতের দিকে ওই বাসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসতে শুরু করেন বলে জানান আরিফ।

তিনি বলেন, 'প্রথমে তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) ইন্টারকমে আমাদের সঙ্গে কথা যোগাযোগ করে বলেন, তাদের কাছে তথ্য আছে সাবেক স্পিকার আমার বাসায় আছেন এবং তারা তল্লাশি চালাবেন বলে জানান।'

'আমি তাদের কাছে লুকাইনি। আমি শিরীনকেও বিষয়টি জানাই। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুমতি দেই। পরে তারা অ্যাপার্টমেন্টে আসেন। তারা শিরীন শারমিনকে "স্যার" সম্বোধন করে জানায়, তাদের জানানো হয়েছে যে তিনি এখানে আছেন এবং তাকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এরপর তিনি তাদের সঙ্গে যান,' বলেন আরিফ।

আরিফ মাসুদ আরও বলেন, 'যখন তিনি (শিরীন) ফোন করে আমার বাসায় আসার কথা বলেছিলেন, তখন আমি ভেবেছিলাম হয়তো সমস্যা মিটে গেছে। কারণ এর আগে "সরকারের" পক্ষ  থেকে জানানো হয়েছিল যে শিরীন শারমিন তাদের হেফাজতে আছেন।'

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই জনসমক্ষে দেখা যায়নি শিরীন শারমিনকে। পরে ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।

২০২৫ সালের মে মাসে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) একটি তালিকা প্রকাশ করে যেখানে গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ৬২৬ জনের নাম ছিল। ওই তালিকার চার নম্বরে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম ছিল।

ছবি: স্টার

আদালতে শিরীন শারমিন

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মঙ্গলবার ভোরে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

এরপর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে লালবাগ থানায় করা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।

মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শিরীন শারমিনকে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। বিশ মিনিট পর একটি সাদা মাইক্রোবাসে তিনি আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান। তিনি আসামাত্র সেখানে অপেক্ষারত সাংবাদিকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

পরে শিরীন শারমিনকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। প্রায় ৭৫ মিনিট তাকে সেখানে রাখা হয়। সেখানে উপস্থিত আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরাও তার ছবি তোলেন।

বিকেল ৩টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি শুরু হয়। ৩টা ১৩ মিনিটে তাকে জনাকীর্ণ আদালতে নিয়ে কাঠগড়ায় রাখা হয়।

কাঠগড়ার এক কোণে দাঁড়িয়েছিলেন শিরীন শারমিন। কয়েক মিনিট পর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা এজলাসে আসেন।

সেসময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাবেক স্পিকারের জন্য চেয়ারের আবেদন করলেও ম্যাজিস্ট্রেট তাতে সাড়া দেননি।

ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কথা বলতে শুরু করেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় মোহাম্মদ আশরাফুল নামের একজনকে গুলির ঘটনায় করা মামলায় শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত বছরের ২৫ মে ভুক্তভোগী আশরাফুল আদালতে এ মামলা করেছিলেন। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে ১৭ জুলাই লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিকে এজাহার হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন।

মঙ্গলবার শুনানি চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা ভুল করে শিরীনের বাবার নামের সময় স্বামীর নাম বলেন। কাঠগড়া থেকে সাবেক স্পিকার নিজেই তা সংশোধন করে দেন।

এরপর ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী শিরিনকে 'ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী' হিসেবে উল্লেখ করে রিমান্ড চেয়ে যুক্তি দেন।

ফারুকী বলেন, 'তিনি ওই সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন।'

বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসানাত ইমরুল কায়সার তার বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করেন।  তিনি প্রসিকিউশনের আবেদনের বিরোধিতা করেন এবং কেন তাকে রিমান্ডে নেওয়া উচিত নয় তার ব্যাখ্যা দেন।

এই আইনজীবী আদালতকে বলেন, 'আমার মক্কেলই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।'

'আসামি কি ভুক্তভোগীকে গুলি করেছেন? তিনি অবস্থান ছিল নিরপেক্ষ,' বলেন তিনি।

আইনজীবীরা শিরীনের অসুস্থতার কথাও উল্লেখ করেন। আইনজীবী হাসানাত বলেন, 'তিনি খুব অসুস্থ। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।'

শুনানি চলাকালে সাবেক স্পিকার কাঠগড়ার ভেতরে বেশিরভাগ সময় চুপ ছিলেন এবং সাংবাদিকদের নোটের দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলেন।

উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ম্যাজিস্ট্রেট ডিবির দুই দিনের রিমান্ড আবেদন এবং আসামিপক্ষের জামিন আবেদন—দুটিই নামঞ্জুর করে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালতের আদেশের পর সাবেক স্পিকারকে মৃদু হাসতে দেখা যায়। পরে তিনি এক নারী কনস্টেবলের সঙ্গে কথা বলেন।

বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে আদালতের ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর মধ্যেই শিরীন শারমিনকে আবার হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। হুড়োহুড়ি ও হট্টগোলের মধ্যে তিনি আচমকা আদালতের সিঁড়িতে পড়ে যান এবং ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন। তখন নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে ঘিরে রাখেন।

এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একটি অংশ আদালত প্রাঙ্গণে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

৬০ বছর বয়সী শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগের আগ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।