বিশ্লেষণ

স্কুলে শিশুদের ভর্তি পদ্ধতিতে পরিবর্তন: লটারি থেকে পরীক্ষায় ফেরা কতটা যৌক্তিক?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

বাংলাদেশে স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ও আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সঠিক পদ্ধতি কী হওয়া উচিত—এই বিতর্ক বেশ পুরোনো।

সম্প্রতি এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। জাতীয় সংসদে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০২৭ সাল থেকে স্কুলে ভর্তিতে বর্তমানের ‘লটারি পদ্ধতি’ বাতিল করে আবারও ‘ভর্তি পরীক্ষা’ চালু করা হবে।

মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।

কেন ও কীভাবে শুরু হয়েছিল লটারি পদ্ধতির?

লটারি পদ্ধতির সূচনার সময় বলা হয়েছিল, এতে শিশুদের শৈশব রক্ষা হবে ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে। ২০১০ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দেন। 

সরকারের যুক্তি ছিল—যে শিশু এখনো স্কুলেই যায়নি, তাকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানো অমানবিক। সেই সময় শিদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা, কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং ভর্তিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমবে বলে মনে করেছিল সরকার। 

২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও এই পদ্ধতি চালু হয়।

লটারি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের যুক্তি

দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর লটারি পদ্ধতি বাতিলের পেছনে প্রধানত মেধা যাচাই ও শিক্ষার মান রক্ষাকে বড় করে দেখা হচ্ছে। গত ১৬ মার্চ সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিগত সরকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে এই পদ্ধতি তার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। 

এর একদিন পর গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, এখন থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে।

সরকারের দাবি, লটারির ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত স্কুলে সুযোগ পাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ফলাফলে। 

তবে প্রশ্ন উঠছে, যে প্রেক্ষাপটে লটারি চালু হয়েছিল, অর্থাৎ শিশুদের ওপর মানসিক চাপ ও কোচিং বাণিজ্য, সেই পরিস্থিতি কি আসলেই বদলে গেছে? 

শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, গত এক মাস ধরে পর্যালোচনা-আলোচনা করে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, খুব সাধারণ ও সহজ পরীক্ষা নেওয়া হবে।

পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্ক ও বিশেষজ্ঞদের মত

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে এখন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা দুই ভাগে বিভক্ত। লটারি পদ্ধতির সমর্থকদের মতে, এই পদ্ধতি অন্তত সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের জন্য নামী স্কুলগুলোর দরজা খুলে দিয়েছিল। একজন দরিদ্র মানুষও তার সন্তানকে লটারির মাধ্যমে ভিকারুননিসা বা হলিক্রসের মতো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারতেন। এছাড়া শিশুদের পরীক্ষার আতঙ্কে পড়তে হতো না।

অন্যদিকে, পরীক্ষার সপক্ষের অভিভাবক ও শিক্ষকরা মনে করেন, লটারিতে পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছেন, মেধা যাচাই ছাড়া সব মানের শিক্ষার্থী ভর্তির ফলে ক্লাসের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থীকে পাঠদানে শিক্ষকদের অনেক সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে, সেই একই ক্লাসে কেউ কেউ দ্রুতই পড়া বুঝতে পারছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গতকাল সোমবার এক সংলাপে বলেছেন, এ ব্যবস্থা (লটারি) প্রত্যাহারের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা জরুরি। লটারির পরিবর্তে আবার পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে এবং কোচিং-প্রাইভেটের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দেবে।

তিনি লটারি ও মেধা পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি ‘মিশ্র ভর্তিব্যবস্থা’ এবং নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বাড়ানোর কথা বলেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এডাল্ট, চাইল্ড অ্যান্ড এডোলেসেন্ড সাইকিয়াট্রি বিশেষজ্ঞ ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান শিশুদের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে লটারি ও এলাকাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সব শিশু সমান সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন পরিবেশ থেকে আসে না। ভর্তি পরীক্ষা নিলে দেখা যায়, সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের শিশুরাই নামী স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। এতে শুরুতেই শিশুদের মনে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। লটারি পদ্ধতি এই বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে।’

মানসিক চাপ ও স্কুলভীতি দূর করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় ভিড় আর প্রতিযোগিতার মধ্যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ থেকে তাদের মনে পড়াশোনার প্রতি অনীহা ও স্কুলভীতি তৈরি হয়। লটারির মাধ্যমে ভর্তি হলে শিশুরা এই অহেতুক মানসিক চাপ থেকে রক্ষা পায়। এর বাইরে কার বাচ্চা কোন স্কুলে পড়ছে—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে লটারি একটি কার্যকর সমাধান। এতে অভিভাবকদের মানসিক চাপও কমে।’

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও এলাকাভিত্তিক বা বাসার কাছের স্কুলে ভর্তির নিয়ম চালু করা উচিত। এতে যাতায়াতের কষ্ট কমে ও শিশু নিজের পরিচিত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।’ 

তার মতে, কেবল ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং শিশুদের সঠিক বিকাশের জন্য মানসম্মত স্কুলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রতিটি স্কুলে খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কী করছে?

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশেষ করে ফিনল্যান্ড বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। সেখানে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আর সব স্কুলের মান কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে কোনো ‘এলিট স্কুল’ কালচার বা ভর্তি যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের দেশে মানসম্মত স্কুলের সংখ্যা কম বলেই লটারি ও পরীক্ষার জটিলতা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন যে, চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করে জনমত নেওয়া হবে।

যেহেতু এটি কোনো আইনি বিষয় নয় বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, তাই সরকার চাইলে সহজেই এই পরিবর্তন আনতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সবকিছু ঢেলে সাজানোর আগে ‘মিশ্র পদ্ধতি’ (লটারি ও মেধার সমন্বয়) কিংবা এলাকাভিত্তিক কোটা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন।