বিশ্লেষণ

প্রাণবন্ত বিতর্ক, তবুও অনেক কিছু বাকি

মহিউদ্দিন আলমগীর
মহিউদ্দিন আলমগীর

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে একটি কার্যকর সংসদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। অনেক দিন পর সংসদে বেশ প্রাণবন্ত বিতর্ক দেখা গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার না হওয়ায় সংসদের দুর্বলতাও সামনে এসেছে।

বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের ডাক গণতান্ত্রিক পরিবেশের আশা জাগিয়েছে। তবে কার্যপ্রণালীর ত্রুটি ও প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা সংসদীয় রীতিনীতির অপূর্ণতাকেও ফুটিয়ে তুলেছে।

নতুন এই ত্রয়োদশ সংসদে সবাই আশা করছে, আগের মতো বয়কট বা নামমাত্র আলোচনার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। বরং গঠনমূলক আলোচনা হবে এবং সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা হবে—এমনটাই সবার প্রত্যাশা। 

১২ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই প্রথম অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ (এবং ওই সময় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা), জুলাই সনদ, সংস্কার প্রস্তাব, জ্বালানি সংকট, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে হট্টগোল হলেও বিরোধীদের ওয়াকআউট ছিল মূলত একটি গঠনমূলক প্রতিবাদের অংশ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের তোলা বেশ কিছু বিষয় মেনে নেওয়ায় ও সহযোগিতার আহ্বান জানানোয় ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেছেন যে, জাতীয় সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই করতে হবে। তিনি মনে করেন, সরকারি বা বিরোধী দল—যে কোনো পক্ষ ব্যর্থ হলে দেশ ও সংসদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হওয়ায় সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয় ছিল। এটি নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা হলেও মন্ত্রিসভার সদস্যরা আশ্বাস দিয়েছেন যে, তারা পরে আরও শক্তিশালী বিল নিয়ে আসবেন।

সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এখনো একটি উত্তপ্ত ইস্যু হয়ে আছে। একটি 'সংবিধান সংস্কার কমিশন' গঠন বা সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা তৈরিতে বিএনপির অনীহা জুলাই সনদ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

অন্যদিকে, 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ' অনুযায়ী কাউন্সিল ডাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার তা এড়িয়ে গেছে। এর পরিবর্তে তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব করেছে। 

তবে বিরোধী দল আরও ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়ে এই কমিটিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সময় চেয়েছে।

রাষ্ট্রপতির উদ্বোধনী ভাষণ, মুলতবি প্রস্তাবের কোনো সমাধান না হওয়া এবং তাদের ভাষায় ‘জনস্বার্থবিরোধী’ বিল পাসের প্রতিবাদে বিরোধী দল চারবার ওয়াকআউট করে। তবে প্রতিবারই তারা আবার সংসদে ফিরে আসে। এটি সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের অঙ্গীকারেরই প্রমাণ। 

এছাড়া, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেওয়া 'জ্বালানি কমিটি' গঠনের প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করে, যা ছিল সরকারি দলের সহনশীলতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।

তবে উপজেলায় 'এমপি অফিস' করার মতো কিছু সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করার আশঙ্কায় সমালোচিত হয়েছে। 

সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতাসহ ২২০ জন সংসদ সদস্যই এবার প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। ফলে সংসদে নিয়মমাফিক কাজে ভুলত্রুটি হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা ছিল ও বাস্তবেও তেমনটাই ঘটেছে। 

আইনপ্রণেতাদের অনেক সময় সময়মতো বিলের কপি দেওয়া হয়নি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল পাশের প্রক্রিয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে তারা বিলের কপি ও কাগজপত্র হাতে পেয়েছেন। ফলে সেগুলো সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বেশ কয়েকবার বিল উত্থাপনের সময় মন্ত্রিসভার সদস্যদের খাতা কলমে বা উপস্থাপনায় ভুল করতে দেখা গেছে। আবার বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরাও অর্থবহ আলোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি বিল পাস হয়ে যাওয়ার পর আলোচনার সুযোগ দেওয়ার মতো অস্বাভাবিক চর্চা সংসদীয় কাজের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করেছে।

সংসদ কর্মকর্তাদের মতে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে চিফ হুইপ অত্যন্ত সাধারণ ও তুচ্ছ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করেছেন—যা মূলত সংসদীয় কর্মীদের মাধ্যমেই সমাধান করা যেত। এসব ঘটনা অনেককেই বিরক্ত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না এমন অন্তত দুটি অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, সরকারি দলের অনেক এমপিই অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি যাদের বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল তারাও আসেননি। 

চিফ হুইপ অকপটে স্বীকার করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি ছাড়া সরকারি দলের সদস্যরা কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন না। এই প্রবণতা এটাই প্রমাণ করে যে, সংসদকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের পুরোনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।