করজালে এনে নিকোটিন পাউচে বৈধতা, জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ

সুকান্ত হালদার ও আসিফুর রহমান

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কর কাঠামোর আওতায় আসতে যাচ্ছে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য। যদিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বিশ্বজুড়ে এসব পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে যেখানে উদ্বেগ বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে এই ধরনের পণ্যগুলো করের আওতায় আনার অর্থ হলো বৈধতা দেওয়া এবং এর প্রভাব পড়তে পারে নতুন প্রজন্মের ওপর।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিকোটিন গ্রানুলস ও নিকোটিন পাউচের জন্য নতুন শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস করে এর ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

নতুন করে বিস্তার পেতে যাওয়া নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী অনুমোদন করার কয়েক মাস পর এই প্রস্তাব এলো।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার একদিকে নিকোটিন পাউচকে ক্ষতিকর উল্লেখ করে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে চাইছে, অন্যদিকে কর কাঠামোর আওতায় এনে কার্যত এগুলোকে বৈধ বাণিজ্যিক পণ্যের স্বীকৃতি দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জে নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানা স্থাপনের জন্য ফিলিপ মরিস বাংলাদেশকে অনুমোদন দেওয়ার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গত বছর প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। বর্তমানে এটি স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। ৫৮ লাখ ২০ হাজার ডলার প্রাথমিক বিনিয়োগে স্থাপন করা হবে কারখানাটি। এখান থেকে বছরে ৫৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি নিকোটিন পাউচ উৎপাদন করা হবে বলে প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর বাজার হবে মূলত বাংলাদেশ।

নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলস হলো মুখে ব্যবহারের জন্য তৈরি ছোট টি-ব্যাগের মতো দেখতে এক ধরনের পণ্য, যার ভেতরে রাসায়নিক মিশ্রিত নিকোটিন, সুগন্ধি ও অন্যান্য উপকরণ থাকে। সাধারণত এগুলো মাড়ি ও ঠোঁটের মাঝখানে রাখা হয়।

এগুলোকে নিকোটিনের ‘ধোঁয়াবিহীন’ বিকল্প হিসেবে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু, গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ধোঁয়া না থাকলেও এগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি কম নয়। বিশেষ করে নিকোটিন আসক্তি ও কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রে এর গুরুতর খারাপ প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে, হিটেড টোব্যাকো পণ্য হলো এমন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা প্রক্রিয়াজাত তামাক গরম করে নিকোটিনযুক্ত অ্যারোসল তৈরি করে।

এ বছর বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে ২ হাজার ৩০০ কোটির বেশি ইউনিট নিকোটিন পাউচ বিক্রি হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় গ্রাহক হয়ে উঠছে কিশোর ও তরুণরা।

জাতিসংঘের এই সংস্থা আরও সতর্ক করেছে, স্বাদযুক্ত পণ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে বিপণনসহ আক্রমণাত্মক বিক্রয় কৌশলের কারণে তরুণরা এই নিকোটিনজাত পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরে নিকোটিনের সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ওপর প্রভাব পড়ে। একইসঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদি আসক্তির ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো ফ্রি ইনিশিয়েটিভ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘নিকোটিন পাউচের ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ এগুলোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।’ প্রতিবেদনে সরকারগুলোকে কর বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ ও তরুণদের কাছে বিক্রি সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যান্টি-টোব্যাকো অ্যালায়েন্স (বাটা) এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) বাজেটে এসব পণ্য করের আওতায় আনার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এসব পণ্যে কর বসানো হলে এমন পণ্যের ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণের পথ খুলে যাবে, যেগুলো আসলে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।

তাদের দাবি, এই উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের মূল চেতনার বাইরে। এ ধরনের উদীয়মান নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা উচিত, যা সংশোধনীতে ছিল।

পাশাপাশি সরকারের এই সিদ্ধান্ত তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (এফসিটিসি) অধীনে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ এফসিটিসি সইকারী দেশ। তামাক ব্যবহার ও নিকোটিন নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এটি একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য চুক্তি। সরকারও ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এখনও তামাক ব্যবহার।

পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘নিকোটিন পাউচ অত্যন্ত আসক্তিকর। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য এগুলো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সিগারেটের মতোই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সিগারেটের চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। কাজেই এসব পণ্য বিপণনের বৈধতা দেওয়ার কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তিই নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকজাত পণ্য থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আসে, তারচেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয়ে যায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে। সেইসঙ্গে উৎপাদনশীলতার ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ নিকোটিন পাউচ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। আরও ৩০টির বেশি দেশ এসব পণ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।’

‘সংবিধান ও আইনের আলোকে সরকারের দায়িত্ব হলো ক্ষতিকর পণ্য নিয়ন্ত্রণ করা। নতুন ক্ষতিকর পণ্য বাজারে আনার সুযোগ সৃষ্টি করা সরকারর কাজ না। নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে কার্যত সেগুলোকে বৈধতা দিতে যাচ্ছে সরকার। এটা তো তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা’, যোগ করেন তিনি।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘কিশোর ও তরুণদের মধ্যে নিকোটিন পাউচের ব্যবহার বাড়তে থাকলে তারা অল্প বয়সেই নিকোটিন আসক্তির শিকার হতে পারে। পরবর্তী সময়ে তাদের সিগারেটসহ অন্যান্য তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, ‘রাজস্বের উৎস হিসেবে নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর নির্ভর করা অযৌক্তিক ও বিপজ্জনক। কারণ, এতে জনস্বাস্থ্যের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, ‘নিকোটিন পাউচ ব্যবহারের ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যগত ক্ষতি হবে, তার তুলনায় যে রাজস্ব পাওয়া যায়, সেটা অনেক কম।’

তিনি সতর্ক করেন, ‘তরুণরা এ ধরনের পণ্য ব্যবহার করা শুরু করলে দেশে সুস্থ, কর্মক্ষম ও জনমিতিক সুফল অর্জনে সক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হবে।’

তার মতে, ‘কর আরোপ করে নিকোটিন পাউচকে বৈধতা না দিয়ে বরং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত।’