সবদিকেই খরচ ঊর্ধ্বগামী, যাঁতাকলে মধ্যবিত্ত
মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাপন ছকে বাঁধা থাকে। কর্মস্থলের খুব কাছাকাছি না হলেও যাতায়াত করা যায়, এমন দূরত্বে একটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া। ঘরে একটি এসি, হয়তো একটি মোটরসাইকেল বা ছোট একটি গাড়ি থাকে। ছুটির দিনে হয়তো পরিবার নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া। মাস শেষে যদি সম্ভব হয়, সামান্য কিছু টাকা সঞ্চয় করা।
এটি কোনো বিলাসী জীবনের ছবি নয়। এটা অনেকটা—কারও কাছে হাত না পেতে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার চেষ্টা। কিন্তু দিন দিন বেড়ে চলা জীবনযাত্রার খরচের কারণে মধ্যবিত্তের সেই চেনা ছক এখন হুমকির মুখে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রেজওয়ানা রহমানের কথাই ধরা যাক। গত আগস্ট মাসে তিনি যখন বিদ্যুতের বিল হাতে পান, ভেবেছিলেন বিল আগের চেয়ে কম আসবে।
কারণ, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের পর জুলাইয়ে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ছিল। তাই পরিবারের একমাত্র এসিটি সেভাবে চালানোই হয়নি। লাইনের গ্যাসের সরবরাহও ঠিক ছিল। ফলে ইনডাকশন চুলাও ব্যবহার করতে হয়নি।
রেজওয়ানার ধারণা ছিল, তার দুই বেডরুমের ছোট ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার টাকার নিচেই থাকবে। কিন্তু বিল হাতে পেয়ে দেখেন ৩ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
রেজওয়ানা বলেন, ‘এত বেশি বিল আসার পেছনে বিদ্যুতের বাড়তি দাম ছাড়া আর কোনো কারণ থাকতে পারে না।’
অর্থনীতিবিদদের মতে রেজওয়ানার মতো মধ্যবিত্তের এই দুর্ভোগের পেছনে আছে ‘স্টিকি অ্যান্ড স্টাবর্ন ইনফ্লেশন’ বা ‘জেদি মূল্যস্ফীতি’।
সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মূল্যস্ফীতির হার কয়েক বছর ধরেই মানুষের স্বস্তিদায়ক সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে।
এই চাপ সমাজের নানা স্তরে দৃশ্যমান। ভর্তুকি মূল্যের নিত্যপণ্যের লাইনে মানুষের ভিড় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। আর যে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একসময় মাস শেষে কিছুটা সঞ্চয় করতে পারত, তাদের সেই জমানো টাকা এখন নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এই মূল্যস্ফীতি ধনীদের জন্য কোনো বড় সমস্যা নয়। অন্যদিকে হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের কিছু সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচি থাকে। কিন্তু মধ্যবিত্তরা পড়েছে দোলাচলে। তাদের আয় এতটাই যে তারা সরকারি সাহায্য পাওয়ার যোগ্য নয়, আবার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর মতো আর্থিক সামর্থ্যও তাদের নেই।
ধনীদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো: ‘আমি কি এটা কিনতে পারব?’ আর মধ্যবিত্তের প্রশ্ন হলো: ‘সঞ্চয়ে হাত না দিয়ে বা অন্য কোনো খরচ না কমিয়ে আমি কীভাবে এটা কিনব?’
বছরের পর বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় পরিবারের জমানো সেই সঞ্চয়টুকুও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। রেজওয়ানা এবং তার মতো লাখো মধ্যবিত্তের মাসের হিসাব এখন আর কিছুতেই মিলছে না।
চারদিক থেকে চাপ
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরকার দেশে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং সিলিন্ডারের গ্যাসের দাম বাড়ায়।
এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবেই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর এসে পড়ে। সব দিক থেকেই তাদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে—বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বাড়ায় খাবারের দাম বৃদ্ধি এবং রান্না করার খরচ বেড়ে যাওয়া।
অর্থনীতিবিদরা এই চাপ নিয়ে সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল। দুবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গত জুনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছিল, বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
সিপিডির সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই মূলত সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে নিয়ে গেছে।
এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট। শহরের অনেক বাসাবাড়িতেই রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে, যা বেশ ব্যয়বহুল। এর ওপর ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা মাহমুদা কামাল বলেন, ‘ছুটির দিনে বা সরকারি ছুটির দিনে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন রাইস কুকার ও এয়ার ফ্রায়ারের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’
ইনডাকশন কুকার কেনার কথা ভেবেছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাহমুদাও। কিন্তু পরে বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ার ভয়ে সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন।
ফরিদপুর শহরের বাসিন্দা লালন্তিকা পিয়াসি জানান, তার এলপিজি সিলিন্ডারের খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। এই খরচ মেটাতে অন্য খরচগুলো কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাকে।
বেড়েছে খাবারের খরচ
শুধু জ্বালানি বিলই নয়, মধ্যবিত্তের এই চাপ বাজারের থলে থেকে ডাইনিং টেবিলের থালাতেও এসে পৌঁছেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বাজারে গেলেই এখন হিসাব করতে হয় যে কোন জিনিসটি না কিনলেও আপাতত চলবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে এই হার ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ থাকলেও, মার্চে তা বেড়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং জুনে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়। মূলত মাংস, মাছ, ফল, সবজি এবং মসলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রেজওয়ানা বলেন, ‘যখনই বাজারে যাই, দেখি কোনো না কোনো জিনিসের দাম আবার বেড়ে গেছে।’
এর মধ্যে সরকার খুচরা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দামও বাড়িয়েছে। মোটরসাইকেলে করে যাতায়াত করা ঢাকার বসিলা এলাকার বাসিন্দা রকিবুল হাসান এর প্রভাব টের পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অকটেনের দাম বেশ কিছুটা বেড়েছে, যা আমার মাসিক বাজেটে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে।’
রকিবুল জানান, সম্প্রতি তার বেতন কিছুটা বাড়ায় তিনি বাড়তি এই খরচ কোনো রকমে সামলাতে পারছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
গত জুনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছিলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে আছে, যার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে মানুষের আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। জুনে আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা ওই সময়ের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।
ফুরিয়ে যাচ্ছে সঞ্চয়
ক্রমাগত এই মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এখন আর শুধু সাময়িক কোনো ধাক্কা নয়। দীর্ঘমেয়াদি এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, ইউটিলিটি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার খরচ বারবার বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যাদের আয় কাগজে-কলমে বেড়েছে, তারাও বাস্তবে আরও দরিদ্র হয়েছেন। কারণ, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়েনি।’
রেজওয়ানার জীবনের আর্থিক টানাপোড়েন এই বৃহত্তর চিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। চারজনের পরিবারে একমাত্র স্বামী আয় করেন। খুব হিসাব করে তাদের সংসার চালাতে হয়।
বেশি দিন আগের কথা নয়, রেজওয়ানা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন। কিন্তু গত প্রায় ছয় মাস ধরে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকায় সঞ্চয়ের জায়গাটি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এখন তো শুধু বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে গেছে। সঞ্চয় করব কীভাবে?’
সেলিম রায়হান বলেন, ‘এই পরিবারগুলোর কি এখনো কোনো সঞ্চয় আছে? দিন দিন এর উত্তর “না” হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, অনেকেই তাদের জমানো টাকা তুলে ফেলছেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাচ্ছেন, সস্তা পণ্য কিনছেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পেছনে খরচ কমাচ্ছেন।
তার মতে, মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে। কারণ, তারা একদিকে যেমন সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে থাকে, অন্যদিকে তাদের আবাসন, শিক্ষা এবং পারিবারিক খরচের বিশাল একটি বোঝাও টানতে হয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘অর্থনৈতিক চাপে মানুষের সামাজিক অবস্থান স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।’
অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
দেশের এই মূল্যস্ফীতি এখন আর শুধু বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কার ফলাফল নয়। এটি দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এই সংকটের স্থায়িত্বই একে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
তিনি বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারগুলোর বাজেটের বড় অংশই চলে যায় খাবারের পেছনে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তাদের খরচ কমানোর আর কোনো সুযোগই অবশিষ্ট নেই।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে খাবারের দামের মাধ্যমে আঘাত হেনেছে।
তিনি জানান, এর প্রভাব শুধু পরিবারের বাজেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান মনে করেন, প্রচলিত মুদ্রানীতি বা অর্থের জোগান কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এই সংকট উত্তরণে খুব একটা কার্যকর নয়। কারণ, এই সংকট মূলত পণ্য সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা, বাজারের অব্যবস্থাপনা এবং বিতরণ কাঠামোর ত্রুটির কারণে তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারকে বুঝতে হবে যে বাজারে সরবরাহ কম থাকার কারণেই মূলত এই মূল্যস্ফীতি। তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতির এই ধীরগতির সময়ে মানুষের কেনাকাটা বা চাহিদা কমানোর চেষ্টা করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, এতে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার মূল কারণগুলোর কোনো সমাধান হবে না, উল্টো অর্থনীতির আরও বেশি ক্ষতি হতে পারে।