নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে সরকার

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও যেন রপ্তানি আয় সুরক্ষিত থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ে—সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান নিশ্চিত করেন, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে সই হবে। আর ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সই হওয়ার কথা থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর সে কারণে কার্যদিবস কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি ভার্চ্যুয়ালি সম্পন্ন হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো—আমেরিকান তুলা ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশি পোশাককে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া। প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী, যে রপ্তানিকারকরা প্রমাণ করতে পারবে যে তাদের পণ্যের ৬০–৭০ শতাংশ উপকরণ (যেমন তুলা) যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা, তারা এসব উপকরণের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে।

বাণিজ্য সচিব আরও জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কহার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে, যদিও কত শতাংশ কমানো হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কয়েক মাস ধরে চলা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফলেই এই ছাড়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এদিকে, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্যবিষয়ক আলোচক দলের সদস্যরা এই সপ্তাহে টোকিও সফরে যাচ্ছেন। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বড় কোনো বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে চুক্তি সই হবে।

উপদেষ্টা পরিষদ গত ২২ জানুয়ারি ইপিএ অনুমোদন দেয়, যা আগামী নভেম্বরে এলডিসি মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধার কাঠামো নির্ধারণ করবে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইপিএ সইয়ের জন্য আমরা প্রস্তুত।

এই চুক্তির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বাজার সুবিধা পাওয়া যাবে। চুক্তিটি কার্যকর হলে, জাপান বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত সাত হাজার ৩৭৯টি পণ্যে (যা মোট রপ্তানির ৯৭ শতাংশ) শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেবে—এর মধ্যে প্রধান পোশাক পণ্যও রয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ ১৮ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এক হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে।

পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি ইপিএতে সেবা খাতের বাণিজ্যও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশ ১২টি সেবা খাতের ৯৭টি উপখাত জাপানের জন্য খুলবে এবং জাপান ১২০টি উপখাত বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করবে। এতে জাপানি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়বে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এশীয় রপ্তানি বাজার, যেখানে বছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়—যার বড় অংশই পোশাক। গত মাসে জাপান নিশ্চিত করে যে তারা ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেবে।

এলডিসি সুবিধা হারানোর পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এসব বাণিজ্য চুক্তি।

গবেষণা বলছে, এলডিসি–সংক্রান্ত সুবিধা শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ বছরে সর্বোচ্চ আট বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।