নির্বিচার মৎস্য আহরণে ছোট হয়ে যাচ্ছে দেশের ইলিশের গড় আকার
অতিরিক্ত মাছ ধরা, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং জাটকা (ছোট ইলিশ) নিধনের কারণে ইলিশের গড় আকার ও ডিম উৎপাদন কমে যাচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে গতকাল বুধবার আয়োজিত এক সেমিনারে এমনটি বলেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম।
দেশে ৭-১৩ এপ্রিল জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬ পালিত হচ্ছে। এই উপলক্ষে ঢাকার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে ওই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এই সপ্তাহের প্রতিপাদ্য- 'জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী'
সেমিনারে বলা হয়, নদীতে অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে বড় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যার ফলে সেখানে শেষ পর্যন্ত কেবল ছোট মাছই অবশিষ্ট থাকে। এর বিপরীতে, সাগরের ইলিশ এ ধরনের কোনো বাধা ছাড়াই তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে, যা তাদের যথাযথ বৃদ্ধি ও প্রজননে সহায়ক হয়। এ ছাড়া সাগরে দূষণের মাত্রা কম হওয়াও এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, অঞ্চলভেদে ইলিশের আকারের ক্ষেত্রে একটি তারতম্য লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত পরিবেশগত অবস্থা এবং ইলিশের পরিযান বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
অনুষ্ঠানে এক উপস্থাপনায় বিগত বছরগুলোতে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্যে কিছুটা ওঠানামা দেখা যায়। ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ৩৫ দশমিক ৭ সেন্টিমিটারে স্থির ছিল; এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ২ সেন্টিমিটার হয়।
তবে পরবর্তী বছরগুলোতে এই ধারার পরিবর্তন ঘটে; ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৩৬ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও হ্রাস পেয়ে ৩ সেন্টিমিটারে দাঁড়ায়।
আলম জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য সামগ্রিকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সম্মিলিত কারণ দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত মাছ ধরা, জাটকা নিধন, মানুষের হস্তক্ষেপ, পরিবেশগত পরিবর্তন, পানির গুণমান হ্রাস এবং নদীতে খাদ্যের অভাব।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের মতো এলাকাগুলোতে মাছ সমুদ্রেই তাদের পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। ফলে তারা অধিকতর পরিপক্বতা লাভ করে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের গড় দৈর্ঘ্য ও ওজন বেশি হয়।
দেশের সবচেয়ে বড় আকারের ইলিশ কক্সবাজার অঞ্চলে পাওয়া যায়, যার গড় দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৭৮০ গ্রাম।
এর বিপরীতে, সবচেয়ে ছোট আকারের ইলিশ পাওয়া যায় রাজশাহী অঞ্চলে, যার গড় দৈর্ঘ্য ২৯ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৩৪০ গ্রাম। তিনি আরও যোগ করেন, এখানকার মাছগুলো মূলত নদী ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তুলনামূলক কম অনুকূল।
নদীতে ব্যাপক হারে মাছ ধরা এবং অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে বড় মাছগুলো নিয়মিত ধরা পড়ছে, ফলে জলাশয়ে শুধু ছোট মাছই অবশিষ্ট থাকছে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বেছে বেছে বড় মাছ শিকারের ফলে নদীতে বড় আকৃতির ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
সমুদ্র থেকে নদীতে আসার পথে উপকূলীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ফলে পরিপক্ব ইলিশের সংখ্যা আরও হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, বংশবিস্তারের আগেই অনেক মাছ ধরা পড়ে যাওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ছাড়া নদীতে ক্রমবর্ধমান দূষণ এবং খাদ্যের অভাবও ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে গত কয়েক বছরে ইলিশের প্রাক্কলিত ডিম উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে যা ছিল পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৭২০ কেজি, তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২১ সালে সাত লাখ ৮৬ হাজার ৩১৪ কেজি, ২০২৩ সালে আট লাখ পাঁচ হাজার ৫১৫ কেজি এবং ২০২৪ সালে আট লাখ ১১ হাজার ৭১১ কেজিতে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজিতে পৌঁছায়।
তবে ২০২৫ সালের প্রাক্কলনে একটি মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একটি হিসাবে আট লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি উৎপাদনের মাধ্যমে বৃদ্ধির আভাস পাওয়া গেলেও অন্য একটি হিসেবে তা সাত লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে।
আলম আরও জানান, প্রাক্কলিত ডিম উৎপাদনের এই সাম্প্রতিক পতনের পেছনে পূর্বোক্ত কারণগুলোই দায়ী। কারণ বড় ও পরিপক্ব প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে গেলে তা সরাসরি ইলিশের বংশবিস্তার ও ডিম উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে।
মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, জাটকা উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে এবং ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে ইলিশের ডিম থেকে পোনা তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ইলিশের স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণমান বজায় রেখে কীভাবে এর উৎপাদন বাড়ানো যায়, বিজ্ঞানীদের সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে।
ইলিশের সংকটকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই মাছ সহজলভ্য করতে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, জাটকা ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে।