চিকিৎসকদের দিয়ে খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন বন্ধ হচ্ছে
খাদ্য কোম্পানিগুলো চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে ব্যবহার করে আর তাদের পণ্যের প্রচার করতে পারবে না। কারণ ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে এমন প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন বন্ধে নতুন বিধি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এই নতুন বিধি গত ১৪ ডিসেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। 'নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) বিধিমালা, ২০২৫' বিধি গেজেট প্রকাশের ছয় মাস পর থেকে কার্যকর হবে।
নতুন এই বিধির ফলে খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ার ধরন বদলে যাবে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে। এসব খাদ্যের বিজ্ঞাপনে এতদিন বিশেষজ্ঞদের মতামত, বাড়িয়ে বলা পুষ্টিগুণ বা প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্যের সঙ্গে তুলনা করে প্রচার চালানো হতো।
বিএফএসএ জানিয়েছে, অনেক কোম্পানি তাদের পণ্যে বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ বেশি দেখিয়ে, পুষ্টিগুণ বাড়িয়ে বলে কিংবা পুষ্টিহীন খাবারকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে তুলে ধরে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করছে।
বিএফএসএর প্রয়োগ শাখার সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, 'আমরা দেখেছি, অনেক কোম্পানি তাদের পণ্যের লেবেলে যে পরিমাণ উপাদানের কথা বলে, বাস্তবে তা থাকে না।'
তিনি আরও বলেন, 'কিছু প্রতিষ্ঠান পুষ্টিহীন খাবারও মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিক্রি করছে। তাই নতুন নিয়মগুলোর উদ্দেশ্যই হলো এসব অনিয়ম বন্ধ করা।'
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো বিজ্ঞাপনে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি করা যাবে না। কোনো পণ্য নিয়মিত খেলে রোগের ঝুঁকি কমবে বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যাবে, এমন কথাও বলা যাবে না। আবার, একটি মাত্র ঝুঁকি কমালেই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব, এমন ইঙ্গিতও দেওয়া যাবে না।
এই নতুন নিয়মে বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
যেমন, একই ধরনের খাদ্যকে অন্য খাদ্যপণ্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের পণ্যকে সেরা বলা যাবে না, কিংবা অন্য পণ্যকে খাটো করা যাবে না। পণ্যের উৎস, মান বা পুষ্টিগুণ এমনভাবে বাড়িয়ে বলা যাবে না, যা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হবে।
এছাড়া আমদানি করা খাবারকে দেশীয় খাবারের চেয়ে ভালো বা উন্নত দাবি করে প্রচার করা যাবে না। প্রক্রিয়াজাত বা মিশ্র খাবারকে প্রাকৃতিক (ন্যাচারাল) বলে উপস্থাপন করা যাবে না এবং অতিরিক্ত খেতে উৎসাহ দেওয়া যাবে না।
কোনো পণ্যকে হালালসহ যেকোনো ধর্মীয় দাবি করতে হলে স্বীকৃত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা অনুমোদিত সনদ প্রদানকারী সংস্থার অনুমোদন থাকতে হবে।
এমনকি খাদ্য নিরাপত্তা বা পণ্যের মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন কোনো পুরস্কারের কথা উল্লেখ করাও কোম্পানিগুলোর জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিধি অনুযায়ী, বিজ্ঞাপনে এমন কোনো বিষয় রাখা যাবে না, যা কারো শারীরিক গঠন, প্রতিবন্ধকতা, লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে উপহাস বা অপমানজনক।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কঠোর নিয়মের কারণে খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাদের খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ, অনেক কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞদের মতামত বা সমর্থনের ওপর ভর করে ভোক্তাদের আস্থা তৈরি করে এসেছে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় খাদ্যগোষ্ঠী প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী নতুন এই নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আগে কোনো স্পষ্ট নিয়ম না থাকায় কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। এখন আমরা জানি, কী করা যাবে আর কী করা যাবে না।'
ভোক্তা অধিকারকর্মীরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা বলেছেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেন ব্যবসার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসার ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি না করেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, 'এই ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তাদের বিভ্রান্তিকর দাবি থেকে সুরক্ষা দরকার, আবার একই সঙ্গে ব্যবসা সহজ করা ও ন্যায্য বাণিজ্যিক চর্চার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে।'