‘জীবন যখন শেষ হয়ে আসছে, তখন মনে হয় জীবন এত সুন্দর’

শাহ আলম সাজু
শাহ আলম সাজু

একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ৯ আগস্ট ৮৬ বছরে পা দিয়েছেন। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনে নাটক, অভিনয়, সংগঠন ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত এই নাট্যজন বলছেন, জীবন যত ফুরিয়ে আসছে, বাঁচার আকাঙ্ক্ষা ততই তীব্র হচ্ছে—তবে নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য।

রামেন্দু মজুমদার নাট্যদল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সম্পাদনা করছেন ‘থিয়েটার’ পত্রিকা। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

মঞ্চনাটকে তার অবদান দীর্ঘদিনের। এখনো ‘লাভ লেটার’ ও ‘মেরাজ ফকিরের মা’ নাটকে অভিনয় করছেন তিনি। তার স্ত্রী ফেরদৌসী মজুমদার ও একমাত্র কন্যা ত্রপা মজুমদারও যুক্ত নাট্যচর্চার সঙ্গে।

দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৮৬ বছরে পা দেওয়ার অনুভূতি এবং জীবন কতটা সুন্দর—এমন প্রশ্নের জবাবে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘জীবন যখন শেষ হয়ে আসছে তখন মনে হয়, জীবন এত সুন্দর! আরও কেন জীবন উপভোগ করতে পারলাম না।’

‘তবে, আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। সবসময় বলি, গরুর গাড়িতে যেমন চড়েছি বিমানেও চড়েছি। একজীবনে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। একটা গান আছে—আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি…। শিল্প নিয়ে অতৃপ্তি আছে, কিন্তু জীবন নিয়ে নেই।’

শিল্প নিয়ে অতৃপ্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো তেমন ভালো কোনো নাটক করতে পারিনি। থিয়েটার স্কুল নিয়ে লড়াই করছি, একটা স্থায়ী জায়গা নেই, মহড়ার জায়গা নেই। অনেকগুলো ব্যর্থতা আছে। আমি যদি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দিকে তাকাই, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা স্থায়ী জায়গার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। কিন্তু, আমাদের নেই। সেজন্য বলব, শিল্পের অতৃপ্তি কোনোদিন যাবে না।’

৮৫ বছর পূর্ণ করার পর একান্ত ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘জীবন যত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আরও বেশি তীব্র হচ্ছে। যদিও ৮৫ বছর অনেক। আগে মনে হতো ৮০ বছর বাঁচলেই হবে। কিন্তু, এখন বাঁচতে ইচ্ছে করে, তবে আমার নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য। স্ত্রীর জন্য, মেয়ের জন্য, নাতনীর জন্য। মনে হয় আমি না থাকলে ওরা স্বজনহীন হয়ে যাবে। তাই আরও বাঁচতে ইচ্ছে করে।’

শিল্পের পথে যাত্রা

শিল্পের পথ বেছে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘এটা ছোটবেলা থেকেই আমি পেয়েছি। সেই পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। আমার বাবা অভিনয় করতেন, বড় ভাই অভিনয় করতেন, ছোট বোন অভিনয় করতেন। সুতরাং মনে হয়েছে, এটাই আমার জীবনে স্বাভাবিক।’

‘তারপর বড় হয়ে নাটক করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। এরপর মনে হয়েছে আমার মতো করে যা কিছু আমি বলতে চাই শিল্পী হিসেবে, তার সবকিছু নাটকের মধ্যে রয়েছে। যার জন্য নাটকের পথ বেছে নিয়েছি, শিল্পের পথ বেছে নিয়েছি।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নাট্যদল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে মনে হতো, দেশ স্বাধীন হলে আমরাও বাংলাদেশে নাটকের দল করব। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কবীর চৌধুরীর অফিসে বসে কাজটি করি। কবীর চৌধুরীকে সভাপতি করা হয়। ইকবাল বাহার চৌধুরী সভাপতি; আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ইকবাল বাহার চৌধুরী সহসভাপতি; আমি সম্পাদক। ফেরদৌসী মজুমদার, আহমেদ জামান চৌধুরী ছিলেন। আহমেদ জামান চৌধুরী থিয়েটার ৭২ নাম রাখলেন। আমরা ৭২ বাদ দিয়ে শুধু থিয়েটার রাখলাম। এভাবেই থিয়েটার প্রতিষ্ঠা পেল। সিদ্ধান্ত নিলাম নিয়মিত নাটক করব আর থিয়েটার পত্রিকা করব। ওই বছর নভেম্বরে পত্রিকা বের হলো। কিন্তু, নিয়মিত নাটক হলো না। আরও কিছুদিন লাগলো।’

৫০ বছরের বেশি সময় ধরে থিয়েটারের অর্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময়ই চেয়েছি জীবন-ঘনিষ্ঠ নাটক করতে, তা পেরেছি। সমসাময়িক জীবনের ঘটনাকে নাটকের মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছি। আমাদের একটা বড় বিষয় ছিল আবদুল্লাহ আল মামুন আমাদের দলের নাট্যকার। তিনি দলের উদ্দেশ্য জানতেন, সেভাবেই নাটক লিখেছেন। দুটো বিষয় আমাদের দলের নাটকে ঘুরে ফিরে এসেছে—মুক্তিযুদ্ধ ও তারুণ্য। সেইসঙ্গে নারীর ক্ষমতায়ন আছে। সব নাটকের মধ্যে বক্তব্য ছিল। আমরা মনে করি, নাটক শুধু বিনোদন নয়, এর মধ্যে দিয়ে মেসেজ দেওয়ার আছে। যদিও এখন আবদুল্লাহ আল মামুন না থাকার কারণে সমসাময়িক নাটক সেভাবে দিতে পারিনি, তবে চেষ্টা আছে। থিয়েটারের বড় সাফল্য হচ্ছে সাধারণ দর্শকদের নাটকে এনেছি, দর্শক বাড়িয়েছি, দর্শককে আকৃষ্ট করতে পেরেছি। থিয়েটারকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘৫৪ বছর ধরে থিয়েটার পত্রিকা করতে পেরেছি। আমিই সম্পাদনা করছি। এটা বড় একটি সাফল্য।’

বাংলাদেশ ও কলকাতার থিয়েটার

বাংলাদেশ ও কলকাতার থিয়েটারের তুলনা প্রসঙ্গে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘তুলনা করা কঠিন। ওদের থিয়েটারের ঐতিহ্য দীর্ঘ দিনের। আমাদেরও পূর্ব বাংলায় শুরু হয়েছিল, ৪৭-এর দেশভাগের পর তা কমে যায়। পাকিস্তান আমলে নাটককে তেমন উৎসাহিত করা হতো না। ওদের একটা সুবিধা হচ্ছে ওদের অনেক নাট্যকার আছে। আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রী আছে অনেক। কণ্ঠের অভিনয়ের একটা পার্থক্য আছে। আমাদের হলগুলোতে আগে এসি ছিল না, চেঁচিয়ে কথা বলতে হতো। যার ফলে গলার কোনো কারুকাজ করা যায় না।’

‘কলকাতায় কারুকাজটা দেখতে পাই। তবে, আমাদের এখানে অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, যা ওখানে দেখি না। আমাদের এখানে জীবনকে বোঝার জন্য, জীবনকে জানার জন্য যে নাটক হয়, ওখানে তা সবসময় হয় না। আমি মনে করি বাংলা নাটকের একটা বিবর্তন হয়েছে। তুলনা করা মুশকিল। দুটোই ফলবতী। ভাষা এক, সংস্কৃতি এক তাই কিছু আদান-প্রদান করতে পারি। আমরা নাটক নিয়ে ওখানে গেছি, ওরাও এখানে এসেছে। এটা ভালো দিক। দুটো দেশের মধ্যে যদি সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়, তাহলে অনেক বৈরিতার অবসান হয়। সংস্কৃতির আদান-প্রদান জরুরি।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি কতটা আশাবাদী করে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের আনন্দে-বেদনায়, সাফল্যে-ব্যর্থতায় সবসময় রবীন্দ্রনাথ বড় একটি আশ্রয়। এত বছর সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছি, যেখানেই সংকট হয়েছে রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথের নাটক সেভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। আমাদের দল থেকে তার দুটো নাটক করেছি। কয়েকটি দল করেছে। তার গল্প উপন্যাস থেকেও নাটক হতে পারে।’

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকালে মনে হয় আমাদের দেশে একমাত্র সৈয়দ শামসুল হক আছেন, রবীন্দ্রনাথের পর যার এত বিশাল সৃষ্টি। তার কলমের শক্তি এতটাই বেশি ছিল, এখনো আমরা পরিমাপ করতে পারিনি। আমাদের দলের জন্যও তিনি নাটক লিখেছেন।’

প্রয়াত নাট্যজন আতাউর রহমানের স্মৃতিচারণ করে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘আতাউর রহমান চলে গেছেন, আরও অনেকেই চলে গেছেন। আতাউরের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। অনেক স্মৃতি আছে। বিদেশে গেলে বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায়। আনন্দের সাথী ছিলেন। এত মজা করতে পারতেন। নির্দেশক হিসেবে অনেক উঁচু মাপের ছিলেন। তার নির্দেশনা চমৎকার। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। পড়াশোনা করতেন খুব। অনেক কাজ করেছেন। পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন।’

মেয়ে ত্রপা মজুমদারের সঙ্গে রামেন্দু মজুমদার। ছবি: সংগৃহীত

তরুণ প্রজন্ম ও সংস্কৃতি

এ দেশের তরুণদের নিয়ে আশাবাদী রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘শুধু নাটকের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। সবকিছু দ্রুত পেতে চায়। তরুণদের মধ্যে প্রচুর প্রতিভা আছে। যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে অনেক কিছু সম্ভব। এজন্য আমাদেরও ব্যর্থতা আছে। তারপরও আমি আশাবাদী।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একজন শিক্ষিকার ভিডিও পোস্টকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবাই ফেসবুকে স্বাধীন মতো, নিজের ইচ্ছে মতো লিখতে পারে। কেউ কোনো সীমা মানে না, মনে করে স্বাধীন। মানুষের চরিত্র হনন করাটা খুব আনন্দের হয়ে গেছে অনেকের কাছে। এটা নিন্দনীয়। একজন শিক্ষিকা গানের সঙ্গে যা করেছেন, তাতে কী এমন হয়েছে! তিনি মন্দ কিছু করেননি। শেষে দেখা গেছে সবাই তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে শিক্ষকদের যে লাঞ্ছনা করা হয়েছে, জুতার মালা পরানো হয়েছে, এটা আমাকে খুব ব্যথিত করেছে। নেত্রকোণায় একজন শিক্ষকের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই শিক্ষক চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বলেছিলেন, মোটরসাইকেল তো কিনতে পারব না। এটা আমাকে ভাবিয়েছে। এরপর আমার প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে একটা মোটরসাইকেল কিনে দিই।’

একটি দেশের জন্য শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছাড়া কোনো জাতি, বিশেষ করে বাঙালি এগিয়ে যেতে পারবে না। আগের সময়ে অনেক পরিবারে গান-বাজনা করতে পারত, প্রচলন ছিল। ছোটবেলা থেকে, স্কুল থেকে অভ্যাসটা গড়ে তোলা দরকার। শিল্প-সাহিত্য দরকার। একটি দেশের জন্য সংস্কৃতি ভীষণ প্রয়োজন। এটা ছাড়া চলবে না। এজন্য সরকারকে আগ্রহী হতে হবে, যেন ছেলে-মেয়েরা ছোটবেলা থেকে এই পথে ধাবিত হতে পারে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে গড়ে উঠতে হবে।’

যে বিষয়গুলো আনন্দ দেয়

কী কী বিষয় আনন্দ দেয়—জানতে চাইলে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মানুষের সাফল্য আমাকে আনন্দ দেয়, পত্রিকায় কারো সাফল্যগাথা দেখলে আনন্দ পাই। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১২-১৩ বছর একটি অনুষ্ঠান করেছি সাধারণ মানুষ নিয়ে। ৪০০ মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। খুব সাধারণ মানুষ সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তারা খ্যাতির জন্য কাজ করেন না। ভালো কাজের জন্যই ভালো কাজটি করেন। তাদের কথা তুলে ধরেছি। একজন রিকশাওয়ালা হাসপাতাল করেছেন, তাকে তুলে ধরেছি। এগুলো আমাকে আনন্দ দেয়।’

মঞ্চে এখনো অভিনয় করছেন, কিন্তু টেলিভিশন নাটকে তেমন দেখা যায় না কেন? জানতে চাইলে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘এ দেশের টেলিভিশনের প্রথম নাটক “একতলা দোতলা”। ওখানে অভিনয় করেছি। টেলিভিশনে বহু বছর খবর পড়েছি। কর্তৃপক্ষ চাইতেন না যারা খবর পড়েন তারা অভিনয় করুক। এজন্য অভিনয় কম করা হয়েছে। আবার, অভিনয় ছাড়া সংগঠনের প্রতি ঝোঁকটা বেশি ছিল সবসময়। “মেরাজ ফকিরের মা” নাটকে অভিনয় করেছি। এই নাটকে অভিনয় করে আনন্দ পাই। “লাভ লেটার” নাটক করছি। এই নাটকে অভিনয় করে ভীষণ তৃপ্তি পাই। এই নাটক নির্দেশনা দিচ্ছেন আমার কন্যা ত্রপা মজুমদার।’

দীর্ঘ জীবনে স্ত্রী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বড় একটা জায়গা তার আছে। আমি ঘরের কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হইনি। আমি যত কাজ বাইরে করেছি। যদি ফেরদৌসী না থাকতেন, তাহলে সম্ভব হতো না। মেয়ের পড়ালেখা থেকে শুরু করে সব তিনি করেছেন। তাই আমি বাইরে নানারকম কাজ করতে পেরেছি। আমরা একই কাজে আছি। শিল্পের পথে আছি। যেজন্য সহায়ক। আমাদের মেয়েও একই পথে আছে। ত্রপা অনেক সিরিয়াস। নাটকের ক্ষেত্রে, শিল্পের ক্ষেত্রে। আমি মনে করি আমাদের জীবন পূর্ণ হয়েছে।’