‘চোখের সামনে ঘরটা ধসে গেল, এখন কী করব?’
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বিধবক গ্রামের রাবেয়া খাতুন। চার বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর তার ছেলে আবার ঋণ করে একটি ছোট ঘর তৈরি করেন। কিন্তু বন্যার প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ধসে গেছে তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়টি।
রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘পানি যে এত দ্রুত আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়বে, তা কল্পনাও করতে পারিনি। চোখের সামনে ঘরটা ধসে গেল, সঙ্গে হাঁস-মুরগি, ছাগল সব গেল। এখন কী করব? কীভাবে আবার নতুন করে জীবন শুরু করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
শুধু রাবেয়া খাতুনই নন, বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়দের বাড়ি থেকে নিজ ভিটায় ফিরতে শুরু করা হাজারো মানুষের চোখেই এখন এমন ধ্বংসের চিত্র।
হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। অনেকের ঘরবাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে, আবার অনেকের ঘরে এখনো পানি ও কাদা জমে থাকায় তা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে আছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই দুই জেলায় এখন পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ১১২টি পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে গত বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধের অন্তত ২০০ ফুট ভেঙে যায়। এতে লস্করপুর, লামাতাসি ও পইল ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং প্রায় ৩১ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন।
একইভাবে মৌলভীবাজার জেলায় মনু ও ধলই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। বর্তমানে পানি কমতে শুরু করায় রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও মাছের ঘের থেকে পানি সরে গেলেও ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র।
বন্যার পানিতে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাজিতুন বেগম। অসুস্থ বৃদ্ধ মা, অসুস্থ স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে চার সদস্যের এই পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাদের কিশোরী মেয়ে, যিনি একটি কোম্পানিতে কাজ করেন। সাজিতুন বেগম নিজেও মানুষের বাড়িতে কাজ করেন।
তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাতে পানির তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই ধসে পড়ে আমার ছোট্ট কুঁড়েঘরটি। স্বামী দুই বছর ধরে বিছানায়। মেয়েটার সামান্য আয়ে কোনো রকমে ওষুধ আর সংসার চলে। এই ঘরটাই শেষ সম্বল ছিল, তাও শেষ হয়ে গেল।
একই এলাকার সোহরাব হোসেনও ঋণ করে বাড়ি বানিয়েছিলেন। অসুস্থ স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তান নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।
তিনি বলেন, ‘কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবো বুঝে উঠতে পারছি না। দুশ্চিন্তায় দিন কাটাছে।’
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সাহেব আলী জানান, তার ওয়ার্ডের নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদি গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি তলিয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে লস্করপুর ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
একই রকম পরিস্থিতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ও রহিমপুর ইউনিয়নেও। রহিমপুর এলাকার বাসিন্দা আচকির মিয়া বলেন, ‘কোমর সমান পানিতে ঘরবাড়ির সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নামার সাথে সাথে এখন মাটির দেয়ালগুলো খসে খসে পড়ছে। কী করব, বুঝে উঠে পারছি না।’
মৌলভীবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলার ৪টি উপজেলার ৪২টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে ৪ হাজার ২৭৫টি পরিবারের প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৩ হাজার ৬৬৭টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, জেলায় বন্যার পানিতে প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ৪ হাজার ৬৪৫টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জিএম সরফরাজ বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত নিরূপণ কাজ এখনো শুরু হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারিভাবে পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদান করা হবে।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে সহায়তার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।