চট্টগ্রাম বিভাগে সাড়ে ৫ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি, নষ্ট হয়ে গেছে বই
বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বন্যায় অন্তত ৫৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে।
বাঁশখালীর কোকদণ্ডী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তুহিন আক্তারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য বন্যার পানি নেমে যাওয়া মানেই হতাশার শুরু।
বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার পর তুহিনের পরিবার চার দিন ধরে উপকূলীয় বাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। ফিরে আসার পর তুহিন দেখতে পায়, তার সব বই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে তুহিন বলে, বন্যার আগে আমাদের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষাগুলো দ্রুতই আবার শুরু হবে। কিন্তু এই মানসিক আঘাতের পর আমি কীভাবে পরীক্ষায় বসব? কোনো বই ছাড়াই বা আমি কীভাবে প্রস্তুতি নেব?
তুহিনের বাবা একজন রাজমিস্ত্রি এবং তাদের আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তিনি জানান, নতুন গাইড বই কেনার চেয়ে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত মাটির ঘরটি মেরামতে এখন তাকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
পুরো চট্টগ্রামে হাজারো শিক্ষার্থীর গল্প এখন তুহিনের মতোই। বাঁশখালীর পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাহিমও তার সব বই হারিয়েছে।
তার বাবা আহমদ হোসেন প্রশ্ন তোলেন, যখন পরিবারগুলো জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে এক সপ্তাহ কাটিয়েছে, তখন শিশুরা কীভাবে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেবে?
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামোগত ক্ষতিক্ষতি ব্যাপক। চট্টগ্রাম জেলায় ৩৮৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারে ৬৫টি, বান্দরবানে ৫৬টি, রাঙামাটিতে ৩২টি এবং খাগড়াছড়িতে ২৯টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যায় একাধিক পরীক্ষাকেন্দ্র তলিয়ে যায়। এর ফলে চট্টগ্রামের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চলমান এইচএসসি পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় রাস্তাঘাট থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও সরকারি স্কুল ভবনগুলো শিক্ষাকার্যক্রম শুরুর জন্য এখনো প্রস্তুত নয়।
সাতকানিয়ার কেওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে দেখা যায়, নিচতলায় নবম ও দশম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষগুলোতে কাদার স্তূপ। দক্ষিণ কেওচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিচতলার একাংশে এখনো জলাবদ্ধতা, যার ফলে শ্রেণিকক্ষগুলো তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, বেশ কিছু স্কুল ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এবং ঠিকঠাকভাবে মেরামত না করা পর্যন্ত এগুলো ব্যবহার করা বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চট্টগ্রাম জেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান নিশ্চিত করেন, জেলার ৪৯৫টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১১টি এবং ৩৯৪টি মাদ্রাসা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মান্নান বলেন, আমরা স্কুলপ্রধানদের নির্দেশ দিয়েছি যেন তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্লাস ও পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষয়ক্ষতির ধরন ভিন্ন ভিন্ন, তাই সিদ্ধান্তগুলো মানবিক উপায়ে নিতে হবে। শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার যে শারীরিক ও মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, উপজেলা প্রশাসনকে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা যায়।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন আশ্বাস দিয়েছেন, সরকার সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতির গুরুত্ব যাচাই করছে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে যেন তারা তাদের হারানো শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারে এবং আবার স্কুলে ফিরতে পারে।