৯ বছর ধরে ছোট্ট একটি কক্ষেই ২ লেপার্ড
গাজীপুর সাফারি পার্কে প্রায় নয় বছর ধরে সংকীর্ণ একটি কক্ষে বন্দি রয়েছে দুটি লেপার্ড।
নিয়ম অনুযায়ী উদ্ধারের পর গাজীপুরের শ্রীপুরের এই ব্যবস্থাপনায় তিন সপ্তাহের অস্থায়ী কোয়ারেন্টিনে রাখার কথা থাকলেও সেখানেই লেপার্ড দুটির কেটে গেছে নয় বছর।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে যশোর থেকে পাচারের সময় দুটি লেপার্ড শাবক উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শাবক দুটিকে গ্রহণ করে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠান। তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনের জন্য তাদের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়। শাবক দুটি এখন পূর্ণবয়স্ক হলেও তাদের আবাসনের পরিবর্তন হয়নি।
আজ বুধবার সকাল ১১টায় সাফারি পার্ক পরিদর্শন করে লেপার্ড দুটির আবাসন, চিকিৎসা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন (পিএডব্লিউ)।
পার্ক কর্তৃপক্ষ ও বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনুমতি সাপেক্ষে অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনটির জেনারেল সেক্রেটারি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সাফারি পার্ক পরিদর্শন করে। দলে সংগঠনটির কো-ফাউন্ডার ডা. তারানা হোসেন এবং প্রাণী অধিকারকর্মী রাকিবুল হক এমিল ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘লেপার্ডের জন্য যে ধরনের ইনক্লোজার প্রয়োজন, সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ ও পর্যাপ্ত উচ্চতা থাকা দরকার। ২০১৮ সাল থেকে দুটি লেপার্ড একই ধরনের ইনক্লোজারে রয়েছে। তারা আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ থাকলেও সাফারি পার্কের ধারণা অনুযায়ী তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন নিশ্চিত হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিড়ালজাতীয় প্রাণী সাধারণত নিচে থাকতে চায় না; সুযোগ পেলে উঁচু জায়গায় অবস্থান করে। লেপার্ডও একই ধরনের প্রাণী। তাই তাদের ইনক্লোজারে প্রয়োজনীয় উচ্চতা থাকা জরুরি। কিন্তু যে ইনক্লোজারে তাদের রাখা হয়েছে, সেটি তাদের কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়নি। অন্য জায়গা থেকে উদ্ধার করে এনে রাখার জন্য যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, উদ্ধার-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার কাজগুলো এখনো আটকে আছে।’
লেপার্ড দুটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তাদের ইউরিনেশনের সমস্যা রয়েছে এবং দুর্গন্ধের কারণে আশপাশে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা না গেলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।’
এদিকে ২০২৪-২৫ সালে দেশের বিভিন্ন অবৈধ চিড়িয়াখানা থেকে জব্দ করা বেশ কয়েকটি ভালুকসহ বিভিন্ন প্রাণী সাফারি পার্কে আনা হয়। এর মধ্যে সাফারি পার্কের নিজস্ব ভালুকসহ মোট ১৯টি ভালুককে ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে সেলে রাখা হয়েছে বলে অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
হাতিদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, সাফারি পার্কের হাতিগুলো ২৪ ঘণ্টাই শেকলে বাঁধা অবস্থায় থাকে এবং প্রাকৃতিকভাবে বিচরণের সুযোগ পায় না।
এসব বিষয়ে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশনটি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়েকটি চিঠি দিয়ে উদ্বেগও জানানো হয়েছে। চলতি বছরের ২০ জুন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগকে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আশানুরূপ কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
সাফারি পার্কে একজন মাত্র ভেটেরিনারিয়ান থাকায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এত বড় একটি পার্কে একজন ভেটেরিনারিয়ান যথেষ্ট নয়।
যোগাযোগ করা হলে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০২৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাপনা সহায়তার আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে লেপার্ড রাখার জন্য একটি বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে।’
এছাড়া, লেপার্ড দুটিকে উপযুক্ত পরিবেশে রাখাসহ অন্যান্য বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।