পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবে কী দেবে
পদ্মা নদীর ওপর নতুন ব্যারাজ নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত দেশে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার বলছে, এই প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে, লবণাক্ততা কমাবে, সেচব্যবস্থা উন্নত করবে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে। কিন্তু পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই সতর্ক করছেন, এই ব্যারাজই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবেশগত ও ভূ-প্রাকৃতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটির অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অবশ্য দীর্ঘ সময় ধরে এটিকে ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ নামেই ডেকে আসছিল। কারণ বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে গঙ্গাকে পদ্মা নামে ডাকা হলেও তাত্ত্বিকভাবে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বাংলাদেশের অংশটি গঙ্গার মূলধারা। ভাগীরথী গঙ্গার শাখানদী।
মূলত ভারতের গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর সৃষ্ট পানি সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যেই পাঁচ দশক ধরে এই ধরনের প্রকল্পের আলোচনা চলে আসছে।
পদ্মা ব্যারাজ কী এবং এতে কী আছে?
সহজ ভাষায় ব্যারাজ হলো কপাট বা গেটযুক্ত এক ধরনের অবকাঠামো, যা দিয়ে নদীর পানি আটকে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করে ছাড়া যায়।
রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মাণাধীন পদ্মা ব্যারাজের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ (আন্ডার স্লুইস) ও দুটি ফিশ পাস বা মাছ চলাচলের জায়গা।
প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা। ব্যারাজের গেট বন্ধ করে পানখা থেকে পাংশা পর্যন্ত নদীপথে প্রায় ১২ মিটার উচ্চতায় পানি ধরে রাখা হবে। এতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সরকার যেসব সুবিধার কথা বলছে
প্রকল্পের উদ্যোক্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, এই ব্যারাজটি হলে দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১টি জেলা ও রাজশাহী অঞ্চলের সাড়ে ৬ কোটি মানুষ উপকৃত হবে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করবে এই প্রকল্প।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজে পানি জমিয়ে সেই পানি গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীতে প্রবাহিত করা হবে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পাবনা-রাজশাহীর প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। পাউবোর হিসাব অনুযায়ী, এতে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হতে পারে।
নদীগুলোতে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়লে খুলনা, যশোর ও সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ততার আগ্রাসন কমবে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে, নদী তীরবর্তী অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।
পাশাপাশি মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়তে পারে। ব্যারাজ ও গড়াইয়ের মুখে টারবাইন বসিয়ে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে বছরে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে বলে মনে করছে পাউবো।
পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে বিতর্কগুলো কী?
সমালোচকদের মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পলি বা সেডিমেন্ট আটকে যাওয়া। ভূতত্ত্ববিদ ড. আহাদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি ব-দ্বীপের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বাঁধ দিয়ে নদীর পলি আটকে দেওয়ায় প্রতি ১০০ মিনিটে একটি আস্ত ফুটবল মাঠের সমান ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ টিকে থাকার জন্য প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টন পলি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, বর্তমানে গঙ্গা নদী প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে বয়ে আনে। কিন্তু ব্যারাজের কপাট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই পলি উজানেই আটকে যাবে।
এর ফলে ভাটিতে প্রবাহিত পানি হয়ে উঠবে ‘সেডিমেন্ট-স্টার্ভড’ বা পলিশূন্য ক্ষুধার্ত পানি, যা নদীর পাড় মারাত্মকভাবে ভাঙতে পারে। একই সঙ্গে মেঘনা মোহনায় মিঠাপানির চাপ কমে গেলে সমুদ্রের নোনা পানি আরও গভীরে, এমনকি উত্তর-পূর্বের নিচু হাওর অঞ্চল পর্যন্ত ঢুকে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্যারাজের পেছনে পলি জমে নদীর তলদেশ দ্রুত ভরাট হবে। এতে পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও ভয়াবহ বন্যা তৈরি হতে পারে। ফারাক্কা বাঁধের উজানে ভারতের বিহার ও মালদা অঞ্চলে ইতোমধ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পে যে পরিমাণ সেচের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পানিও ব্যারাজে জমা হবে না। ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে অন্তত ৯ দশমিক ৫ থেকে ২৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি লাগবে, অথচ ব্যারাজে সংরক্ষিত পানির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার।
এছাড়া সব পানি সেচে ব্যবহার হলে নদীপথে নৌ-চলাচল ও মাছের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য পুরো পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঝুঁকিতে ফেলাও যুক্তিযুক্ত নয়।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো মাছের প্রজনন। বিশেষ করে ইলিশসহ বহু দেশীয় মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রকল্পে দুটি ফিশ ল্যাডার রাখার কথা বলা হলেও বাংলাদেশের নদীর মাছ এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে—এমন প্রমাণ নেই।
ফারাক্কার অভিজ্ঞতা কী বলছে?
পদ্মা ব্যারাজের বিতর্কটি বুঝতে হলে আমাদের একটু অতীতে তাকাতে হবে। ১৯৭৫ সালে ভারত আমাদের সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার উজানে গঙ্গা নদীর ওপর ‘ফারাক্কা বাঁধ’ চালু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গার পানিকে ভাগীরথী নদীর দিকে সরিয়ে নিয়ে কলকাতা বন্দর সচল রাখা।
কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানির হাহাকার শুরু হয়। এই সংকটের কারণে ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী ‘গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি’ সই হয়। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
১৯৯৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে পানি বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ৫২ শতাংশ সময় তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি। বর্তমান চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা নিশ্চয়তা বিধান নেই।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে গত ৫২ বছরে এর উজানে (ভারতের বিহার ও মালদায়) নদীর তলদেশে কোথাও কোথাও প্রায় ২০ ফুট পলি জমে গেছে। নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেখানে প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা হচ্ছে। প্রায় ৪০ হাজার পরিবার সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে নানা সময়ে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছে ভারতের বিহার রাজ্য সরকার।
বিশেষজ্ঞদের বাতলানো বিকল্পগুলো কী?
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজ নির্মাণের আগে নদী ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি। ভুল স্লুইসগেট, রেগুলেটর ও পোল্ডারের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
পাশাপাশি গড়াই-মধুমতী ও হিসনা-মাথাভাঙ্গার মতো ভরাট নদীগুলো ড্রেজিং করে পুনরুজ্জীবিত করার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।
যেহেতু ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাই একটি অববাহিকাভিত্তিক নতুন চুক্তির কথাও বলছেন অনেকে। সেখানে শুধু ভারত নয়, নেপালকেও যুক্ত করা হবে। এই চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার গ্যারান্টি ক্লজ এবং পলির ন্যায্য হিস্যা স্পষ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া নেপালের কোশি অববাহিকায় যৌথ জলাধার তৈরি করে শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।
যদি সরকার ব্যারাজ করতেই চায়, তবে প্রচলিত নকশা পুরোপুরি বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদ ড. আহাদ চৌধুরী। তিনি জার্মানির রাইন নদী বা আমেরিকার কলম্বিয়া নদীর উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশেও ‘সেডিমেন্ট বাইপাস টানেল’ (পলি পারাপার সুড়ঙ্গ) ব্যবহারের কথা বলছেন।
এর সুবিধা হলো, বর্ষাকালের পলিযুক্ত কাদা-পানি এই সুড়ঙ্গ দিয়ে সহজে ভাটির দিকে চলে যেতে পারবে এবং ব্যারেজে শুধু শুষ্ক মৌসুমের জন্য পরিষ্কার পানি জমা থাকবে।