এক্সপ্লেইনার

পুলিশ কি মারধর করতে পারে, আইন কী বলছে?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

সাভারের বিকেএসপিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে বাসায় ফিরছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে একটি অটোরিকশা থেকে নামিয়ে তাকে মারধর করে পুলিশ। একপর্যায়ে থানায় নিয়ে গিয়েও তাকে হেনস্তা করা হয়। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে থানা থেকে ছাড়া পান নাঈম।

পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে—এটাই তাদের দায়িত্ব। তবে ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধরের এই ঘটনা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও আইনি এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই নাগরিকদের ওপর পুলিশের চড়াও হওয়া কি আইনসম্মত? এ ব্যাপারে আইন কী বলছে?

মারধর বা নির্যাতন: আইন কী বলছে?

বাংলাদেশের কোনো আইনেই পুলিশকে সন্দেহভাজন, আটক ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে মারধর বা শারীরিক নির্যাতন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

কাউকে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা বা থানায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু জনসমক্ষে লাঠিচার্জ বা শারীরিক লাঞ্ছনা করা পুলিশের কোড অব কন্ডাক্টের পরিপন্থি।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ হলো একটি বিশেষ ফৌজদারি আইন। এটি মানবাধিকার সুরক্ষা ও নির্যাতন প্রতিরোধমূলক আইন হিসেবে পরিচিত। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা, এমনকি ভয় দেখানোও দণ্ডনীয় অপরাধ। 

যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার নির্যাতনে কারো মৃত্যু হয়, তবে ওই কর্মকর্তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। আর আহত হলে অন্তত ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে যে, গ্রেপ্তারের সময় বা হেফাজতে থাকাকালে কোনোভাবেই নির্যাতন করা যাবে না।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা পর্যন্ত পুলিশের গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে যতটুকু বল প্রয়োগ প্রয়োজন (যদি সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। অর্থাৎ, আটক করার পর বা আয়ত্তে আসার পর তাকে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুসারে—পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে, যদি তার বিরুদ্ধে যৌক্তিক সন্দেহ থাকে যে তিনি কোনো অপরাধ করেছেন বা করতে যাচ্ছেন। 

অন্যদিকে, ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বা তথ্য বের করার জন্য পুলিশ কোনোভাবেই শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। পুলিশ কেবল তখনই লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করতে পারে যখন জননিরাপত্তা চরম হুমকিতে থাকে (যেমন দাঙ্গা)। 

বাংলাদেশের সংবিধানও প্রতিটি নাগরিককে নিষ্ঠুরতা থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩৫(৫)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না বা তাহার সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।

নির্যাতিত ব্যক্তির জন্য আইনি প্রতিকার

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনের অধীনে হওয়া অপরাধগুলো অ-জামিনযোগ্য। অর্থাৎ কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্যাতন করার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তার জামিন পাওয়া কঠিন।

যদি কেউ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন, তবে ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এমনকি ঘটনার কোনো সাক্ষী না থাকলেও ভুক্তভোগীর জবানবন্দি এই আইনে বড় প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়।

তবে এই আইনে যদি কেউ কোনো পুলিশ বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাবশত মিথ্যা মামলা করেন, সেক্ষেত্রে অভিযোগকারীরও শাস্তির বিধান আছে।