সন্তান কেন সামাজিক মাধ্যমে আটকে থাকে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আপনার সন্তান একবার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে ঢুকেছে। তারপর একটি ভিডিও শেষ হতেই আরেকটি ভিডিও নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল। একটু নিচে স্ক্রল করতেই এলো নতুন পোস্ট। আরও নিচে গেলে আরও নতুন কিছু। দেখতে দেখতে কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কেটে গেছে, তা আপনি বা সে টেরই পায়নি।

কেন এমন হয়

এক সময় ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক পোস্ট দেখার পর আর নতুন কিছু থাকত না। এখন আর সেই দিন নেই।

Infinite Scroll Advantages and Disadvantages | Built In
ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এমনকি নেটফ্লিক্সেও একটি ভিডিও শেষ হলে পরের ভিডিও নিজে থেকেই চালু হয়ে যায়। ছবি: সংগৃহীত

যত স্ক্রল করা হবে, ততই নতুন পোস্ট আসতে থাকবে। মনে হবে, আরেকটু নিচে গেলেই হয়তো আরও মজার কিছু আছে। এই কৌতূহলই মানুষকে বারবার স্ক্রল করতে বাধ্য করে।

২০২১ সাল পর্যন্ত মেটায় শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আর্তুরো বেজার বলেন, ফেসবুকে সব সময় এমন কিছু সামনে আসে, যা মস্তিষ্কে নতুন করে আনন্দের অনুভূতি বা ডোপামিনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

‘ব্যবহারকারীরা সব সময় মনে করে, আরেকটু নিচে গেলেই হয়তো আরও মজার কিছু পাওয়া যাবে। এটাই ইনফিনিট স্ক্রলের মূল কৌশল,’ বলেন তিনি।

Psychology of Infinite Scroll
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়, নতুন ভিডিওতে কী আছে। অটোপ্লে সেই স্বাভাবিক কৌতূহলকেই কাজে লাগায়। ছবি: সংগৃহীত

 

অটোপ্লে কেন এত শক্তিশালী

ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এমনকি নেটফ্লিক্সেও একটি ভিডিও শেষ হলে পরের ভিডিও নিজে থেকেই চালু হয়ে যায়। এটিই অটোপ্লে।

অনেকে হয়তো ভিডিওটি দেখতে চাননি। কিন্তু ভিডিও শুরু হয়ে যাওয়ায় কয়েক সেকেন্ড দেখেন। এরপর আরেকটি, তারপর আরও একটি। এভাবেই সময় কেটে যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়, নতুন ভিডিওতে কী আছে। অটোপ্লে সেই স্বাভাবিক কৌতূহলকেই কাজে লাগায়।

Infinite scroll best practices: UX design tips and examples
 ছোট ছোট আনন্দ শিশুদের মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। তাই তারা বারবার সেই অনুভূতি পেতে চাই। ছবি: সংগৃহীত

 

লাইক ও নোটিফিকেশন

ফোনে যখনই নোটিফিকেশন আসে, অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে সেটি দেখতে চান। আবার নিজের ছবিতে কত লাইক পড়ল, কে মন্তব্য করল, কে নতুন মেসেজ পাঠাল—এসব দেখার আগ্রহও মানুষকে বারবার ফোন হাতে নিতে বাধ্য করে।

চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট তানভীর শাহরিয়ার বলেন, এসব ছোট ছোট আনন্দ শিশুদের মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। তাই তারা বারবার সেই অনুভূতি পেতে চাই।

তিনি আরও বলেন, এতে শিশুকিশোরদের মধ্যে এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়। তারা নিজের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেয়। ফলে পড়ালেখা, ঘুম, এমনকি পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও কমে যায়।

তানভীর শাহরিয়ার বলেন, কেউ কিছু খুঁজলে একসময় পেয়ে যায়। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই সামনে আসে আরও নতুন কিছু। আবার সেটিই মনোযোগ কেড়ে নেয়। এই চক্রের কোনো শেষ নেই।

এ বিষয়ে মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একটি মামলা চলছে বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়। মামলাটি নিয়ে লড়ছেন আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার। তার ভাষায়, বিষয়টি ‘এবিসির মতোই সহজ’ সন্তানদের মস্তিষ্ককে সোশ্যাল মিডিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্ত করে তুলছে।

তবে এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দুটি। মেটার দাবি, শিশুকিশোরদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর অনলাইন পরিবেশ গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

লস অ্যাঞ্জেলেসে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই মামলায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার কয়েকটি পরিচিত ফিচার—অটোপ্লে ভিডিও, অবিরাম নোটিফিকেশন ও ইনফিনিট স্ক্রল।

গার্ডিয়ান বলছে, নব্বইয়ের দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সঙ্গে এর তুলনা টানছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব ফিচার কি শুধু ব্যবহারকারীর সুবিধার জন্য, নাকি শিশুকিশোর মনকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার জন্যই তৈরি?
মামলায় প্রকাশিত মেটার অভ্যন্তরীণ কিছু নথিতেও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মী এই নকশার অ্যালগরিদম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

Developer creates endless Wikipedia feed to fight algorithm addiction - Ars  Technica
তরুণরা অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করে। ছবি: সংগৃহীত

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন গার্ডিয়ানকে বলেন, তরুণরা অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করে। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়—দেখবে নাকি এড়িয়ে যাবে। তাদের মনে সব সময় কাজ করে, ‘হয়তো পরের পোস্টটাই আরও ভালো হবে।’ আর সেই আশাই তাদের বারবার স্ক্রল করতে বাধ্য করে।

গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মামলার রায় কেবল মেটা বা গুগলের জন্য নয়, পুরো প্রযুক্তি দুনিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যদি আদালত মনে করে, এসব প্ল্যাটফর্মের নকশাই মানুষকে বেশি সময় আটকে রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির নিয়ম বদলে যেতে পারে।

তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন মানুষ যত বেশি সম্ভব সময় সেখানে কাটায়। আর এটাকেই বলে ইনফিনিট স্ক্রল।