১২ বছর বয়সের আগেই স্মার্টফোন, বাড়তে পারে বিষণ্ণতা, ওজন ও ঘুমের সমস্যা
আজকাল অনেক শিশুর হাতেই স্মার্টফোন। পড়ালেখা, বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগসহ সবকিছুর জন্যই ফোন যেন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু শিশুরা কত বয়সে প্রথম স্মার্টফোন পাচ্ছে, আর সেটি কি তাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স নিউজ এক্সপ্লোরারের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন এক গবেষণায় এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যত কম বয়সে স্মার্টফোন পায়, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার লক্ষণ, অতিরিক্ত ওজন ও পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার প্রবণতা তত বেশি দেখা যেতে পারে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও চিলড্রেন’স হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার শিশু বিকাশবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী র্যান বারজিলাই।
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ‘কিশোর মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় বিকাশ’ বা এবিসিডি স্টাডির তথ্য ব্যবহার করেছেন। এটি শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্বাস্থ্যের ওপর পরিচালিত একটি বড় গবেষণা প্রকল্প।
এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি গবেষণাকেন্দ্রের ১০ হাজারের বেশি শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সাধারণত ৯ বা ১০ বছর বয়স থেকে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা শুরু হয় ও পরের কয়েক বছর তাদের পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ১২ বছর বয়সে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর নিজের স্মার্টফোন ছিল। এই বয়সে যেসব শিশুর স্মার্টফোন ছিল, তাদের মধ্যে ৫ দশমিক ৭ শতাংশের বিষণ্ণতা শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব শিশুর তখনো স্মার্টফোন ছিল না, তাদের মধ্যে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই নয়, শরীরের ওজনের ক্ষেত্রেও একটি পার্থক্য দেখা গেছে। ১২ বছর বয়সে যেসব শিশুর স্মার্টফোন ছিল, তাদের বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই গড়ে ফোন না থাকা শিশুদের তুলনায় বেশি ছিল।
স্মার্টফোন থাকা শিশুদের প্রায় ১৬ শতাংশ স্থূলতার পর্যায়ে ছিল। অন্যদিকে, একই বয়সের স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের মধ্যে এই হার ছিল ১২ শতাংশেরও কম।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো শিশু ১২ বছর বয়সের আগেই যত কম বয়সে স্মার্টফোন পেয়েছে, তার মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকিও তত বেশি হওয়ার প্রবণতা ছিল।
শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন থাকা শিশুরা গড়ে প্রতি রাতে প্রায় ১৭ মিনিট কম ঘুমাত, স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের তুলনায়।
১৭ মিনিট শুনতে খুব বেশি মনে নাও হতে পারে। কিন্তু নিয়মিতভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে কম ঘুম হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ১২ বছর বয়সের আগেই যত কম বয়সে কোনো শিশু স্মার্টফোন পেয়েছে, তার কম ঘুমানোর প্রবণতাও তত বেশি ছিল।
গবেষকেরা আরও একটি বিষয় খেয়াল করেছেন। যেসব শিশু ১২ বছর বয়সে স্মার্টফোন ব্যবহার করত না, কিন্তু ১৩ বছর বয়সের মধ্যে স্মার্টফোন পেয়েছিল, তাদের সঙ্গেও স্মার্টফোন না থাকা শিশুদের তুলনা করা হয়।
দেখা যায়, নতুন স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা থাকার কথাও তুলনামূলক বেশি রিপোর্ট করা হয়েছে।
গবেষক দল তাদের ফলাফল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পেডিয়াট্রিকস সাময়িকীতে প্রকাশ করেছে।

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জিয়াওরান সান এ বিষয়ে আগে আরেকটি গবেষণায় কাজ করেছেন। তার দল নিম্নআয়ের পরিবারের ২৬৩ জন লাতিনো শিশুর ওপর পাঁচ বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছিল।
সেই গবেষণায় শিশুদের স্মার্টফোন পাওয়ার বয়সের সঙ্গে পড়ালেখার ফল, ঘুম কিংবা বিষণ্ণতার লক্ষণের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
সায়েন্স নিউজ এক্সপ্লোরারের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি গবেষণার ফল আলাদা হওয়ার কারণ হতে পারে গবেষণার অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা, কোথা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে এবং কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এসব বিষয়।
সান বলেন, বারজিলাইয়ের গবেষণায় স্মার্টফোন পাওয়ার বয়সের সঙ্গে স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, এর অর্থ এই নয় যে স্মার্টফোনই সরাসরি এসব সমস্যা তৈরি করেছে।
সায়েন্স নিউজ এক্সপ্লোরার বলছে, যেসব শিশু আগে স্মার্টফোন পায়, তাদের জীবনযাপন হয়তো আলাদা হতে পারে। তারা হয়তো বেশি সময় একা থাকে, কম পরিশ্রম করে, রাতে বেশি সময় অনলাইনে থাকে বা পরিবারের নিয়মকানুনও ভিন্ন হতে পারে। এসব কারণও ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।
সান মনে করেন, স্মার্টফোন নিজে হয়তো সব সময় সমস্যা নয়। ফোন ব্যবহার করে কেউ পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, শিক্ষামূলক তথ্য খুঁজতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে কিংবা সৃজনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে।
তবে সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন ফোনের ব্যবহার ঘুম, খেলাধুলা, পড়া, পারিবারিক সময় কিংবা সামাজিক জীবন থেকে দূরত্ব তৈরি করে।
তিনি পরামর্শ দেন, শিশুকে স্মার্টফোন দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যেন হঠাৎ করে না নেওয়া হয়। বরং আগে থেকেই ঠিক করা উচিত ফোনটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে।
শিশুর সঙ্গে বসে আলোচনা করা যেতে পারে—দিনে কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা যাবে, কোন সময়ে ফোন ব্যবহার করা যাবে না, রাতে কোথায় ফোন রাখা হবে, খাবারের সময় ফোন ব্যবহার করা হবে কি না, কোন ধরনের অ্যাপ বা কনটেন্ট ব্যবহার করা যাবে।
মনোবিজ্ঞানী জিয়াওরান সানের পরামর্শ, স্মার্টফোন দেওয়ার বিষয়টিকে একটি সচেতন ও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত। না হলে আসক্তি হয়ে গেলে র্যান বারজিলাইয়ের গবেষণায় পাওয়া সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে।