মরিচা পড়া লোহায় হাত-পা কাটলেই টিটেনাস অবধারিত? কখন নেবেন টিকা
সামান্য ক্ষত থেকেও হতে পারে বড় বিপদ। কয়েক দশক আগেও সংবাদপত্রে জুতার বিজ্ঞাপনে এই কথাটি লেখা থাকত।
এ জন্য মরিচা ধরা পেরেক পায়ে বিঁধলে বা পুরনো লোহার তার লেগে কেটে গেলে টিটেনাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। হাসপাতালে ছুটি টিকার জন্য। কিন্তু লোহার মরিচাই কি টিটেনাসের কারণ? নাকি অন্যভাবেও ঘটতে পারে বিপজ্জনক এই সংক্রমণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, মরিচার সঙ্গে টিটেনাসের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, লোহায় মরিচা ধরলেই যে সেখানে টিটেনাসের জীবাণু থাকবে, এমনটি ভাবার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
আসল অপরাধী ‘ক্লস্ট্রিডিয়াম টেটানি’
টিটেনাস বা ধনুষ্টঙ্কার মূলত ‘ক্লস্ট্রিডিয়াম টেটানি’ নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য বলছে, অত্যন্ত শক্তিশালী এই ব্যাকটেরিয়া প্রতিকূল পরিবেশে বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে। এটি সাধারণত মাটি, ধুলোবালি এবং গরু-মহিষের মতো পশুপাখির বিষ্ঠায় বাস করে।
তাহলে মরিচা পড়া লোহার কেন এই বদনাম হলো? এর কারণ হলো পরিবেশ। কোনো লোহার বস্তু যখন দীর্ঘ সময় বাইরে মাটিতে বা আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকে, তখনই তাতে মরিচা ধরে। একই সঙ্গে মাটিতে থাকা টিটেনাসের জীবাণু ওই বস্তুর গায়ে লেগে থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। যখন কোনো ধাতব বস্তু দিয়ে শরীর কেটে যায়, তখন ক্ষত গভীর হলে বা ময়লা থাকলে ব্যাকটেরিয়া সহজেই রক্তে মিশে যেতে পারে।
তাই মনে রাখবেন, পরিষ্কার ছুরি বা গোলাপ গাছের কাঁটা দিয়ে কাটলেও যদি সেখানে মাটি বা জীবাণু থাকে, তবে টিটেনাস হওয়ার ঝুঁকি সমান।
টিটেনাসকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘লক-জ’। মুখ ও চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়ায় রোগটির এমন নাম হয়েছে। টিটেনাস আক্রান্ত রোগী মুখ খুলতে বা গিলে খেতে পারে না। এ ছাড়া তীব্র জ্বর, সারা শরীরের পেশিতে খিঁচুনি ও ব্যথা হতে পারে।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, সঠিক চিকিৎসা না পেলে টিটেনাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রায় ১০ শতাংশ।
কখন টিকা নেবেন
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুরা টিটেনাসের টিকা পায়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি।
টিটেনাস টিকার কার্যকারিতা সাধারণত ১০ বছর পর্যন্ত থাকে। আপনার যদি শেষ ১০ বছরের মধ্যে টিকা নেওয়া না থাকে এবং কোনো কারণে শরীরে গভীর ক্ষত হয়, তবে দ্রুত টিটেনাসের বুস্টার ডোজ নেওয়া উচিত।
ক্ষতটি যদি গভীর হয় বা তাতে মাটি, গোবর অথবা ময়লা লেগে থাকে, তবে সর্বশেষ টিকা ৫ বছরের বেশি আগে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা আবার টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
যদি রান্নার কাজে ব্যবহৃত পরিষ্কার ছুরি বা ঘরে রাখা কোনো ধারালো বস্তুতে সামান্য কেটে যায় এবং আপনার টিকা নেওয়া থাকে, তবে টিটেনাসের আতঙ্কের কারণ নেই।
প্রতিরোধে করণীয়
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, টিটেনাস থেকে বাঁচার সেরা উপায় হলো সচেতনতা। বাগান করা বা কলকারখানায় কাজ করার সময় হাতে গ্লাভস ও পায়ে জুতো পরা জরুরি। কোনো কারণে কেটে গেলে ক্ষতস্থানটি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে হবে।
টিটেনাস অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক রোগ হলেও এটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। তাই শরীর কেটে গেলে বা ছিলে গেলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তথ্যসূত্র: ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি, পপুলার সায়েন্স এবং সিডিসি।