ডেঙ্গুর প্রকোপ: হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ, ফিল্ড হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

এই নির্দেশনায় ঢাকার হাসপাতালগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা খালি করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সরিয়ে নেওয়া কথা ভাবা হচ্ছে।

পাশাপাশি ঢামেক হাসপাতালে একটি ফিল্ড হাসপাতাল চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে রোববার অনুষ্ঠিত এক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে। এর পরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসে বলে কর্মকর্তারা জানান।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে নয়জন মারা গেছেন—এ বছর এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭১ জনে দাঁড়িয়েছে।

গত বছরের একই সময়ের পরিস্থিতি তুলনায় যা ৫৯ জন বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, এই ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৯০২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এতে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৩৮০, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ হাজার ৪৫৩ জন বেশি।

চলতি বছরে সবচেয়ে প্রাণঘাতি মাস ছিল সেপ্টেম্বর। তথ্য বলছে, গত মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে (প্রতিদিন গড়ে চার দশমিক ৯৩ জন) এবং ৪৩ হাজার ৭৭৪টি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে (প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৪৫৯ জন)। সেপ্টেম্বরে মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যা বছরের প্রথম আট মাসে নথিভুক্ত মোট মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যার তুলনায় বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বেড়েছে। এ মাসে এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু এবং আট হাজার ৭৪০ রোগী শনাক্ত হয়েছে, ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

হাসপাতালে হাম রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকায় এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে হাসপাতালগুলো। মে মাসের পর সেপ্টেম্বরে হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত ও দৈনিক গড়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল সবচেয়ে বেশি।

গতকাল পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৭৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী এবং সাত হাজার ১৯৮ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোববার ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক এক সভার ফাঁকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) নুরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘একটি উপায় হলো, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জায়গা থাকলে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে সেখানে সরিয়ে নেওয়া। এতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত কিছু শয্যা পাওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কীভাবে এগোনো হবে, তা নির্ধারণে আজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ বৈঠক করবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নির্ধারিত জায়গার বাইরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের রাখতে হচ্ছে।’

‘আমরা যে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করেছি, সেটিও চালু করার কথা ভাবছি,’ বলেন ফরহাদ।

হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে ঢামেক হাসপাতাল ভবন-২ এ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য তিনটি নির্ধারিত তলা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ রোগীকে রাখা হচ্ছে। হাসপাতালটিতে ৩০০ শয্যার একটি বার্ন ইউনিটও রয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসির উদ্দিন গত সন্ধ্যায় জানিয়েছিলেন, এই বিষয় নিয়ে ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের শয্যাগুলোও রোগীতে পূর্ণ।

অন্যান্য সিদ্ধান্তের বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে  বলা হয়েছে।

সংকটের সময়ও সরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দেয় না। তবে রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যা সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে রোগীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, যোগ করেন নুরুল ইসলাম।

‘তাই ঢাকার বাইরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা সংখ্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।’

ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসকেরাও। তাদের ভাষ্য, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায়, কোনো রেফারেল ছাড়াই রাজধানীতে আসেন। এতে এসব হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত ভিড় আরও বেড়ে যায়।

তারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেই। সেই সঙ্গে এ সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা ও চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয়।