হামের রোগীরা ঢাকামুখী, হাসপাতালের মেঝেতে শিশুদের চিকিৎসা
নয় মাসের শিশু তারিকুলের হঠাৎ জ্বর ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। গত বৃহস্পতিবার তাকে প্রথমে নরসিংদীর একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে গত শনিবার রাতে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন স্বজনেরা।
গতকাল দেখা যায়, ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তিনতলার সিঁড়ির কাছে একটি ম্যাট্রেসের ওপর ঘুমিয়ে আছে শিশুটি। দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে শয্যা ফাঁকা নেই। তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতেই শিশুটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
তারিকুলের মা তাকমিনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোথাও বেড খালি নেই, তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতেই বিছানা পাততে হয়েছে।’
আট মাস বয়সী ইয়াসিনের গল্পটাও একই রকম। গাজীপুর সদর হাসপাতালে তিন দিন চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ঢাকায় শিশু হাসপাতালেসহ তিনটি হাসপাতালে ঘুরেও ফাঁকা বেড পায়নি ইয়াসিনের পরিবার। অবশেষে গত শনিবার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পাঁচতলার সিঁড়ির কাছে একটি ম্যাট্রেসে জায়গা হয় তার।
ইয়াসিনের দাদি রেহানা বেগম বলেন, ‘সব জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও কোনো বেড খালি পাইনি।’
চিকিৎসকেরা জানান, তারিকুল ও ইয়াসিনের মতো অনেক শিশুকেই উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কয়েক দিন চিকিৎসার পর মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকায় আনা হচ্ছে। দীর্ঘ ভ্রমণ তাদের শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে। অন্যদিকে ঢাকার হাসপাতালগুলো রোগীর বিপুল চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এখানে রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর হার দুটোই বেশি।
পরিসংখ্যান দেখে বোঝা যায় দেশে হাম কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হাম বা হামের উপসর্গে ৪০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু। টেস্ট কিট ও সরঞ্জামের অভাবে সবার হামের পরীক্ষা করাও সম্ভব হয়নি।
শুধু ঢাকার তিনটি প্রধান হাসপাতালেই অন্তত ৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৪২ জন, শিশু হাসপাতালে ২৮ জন এবং ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে ২১ জন মারা গেছে। ঢাকা বিভাগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৯, যা সারা দেশের মোট মৃত্যুর ৪৪ শতাংশ।
গতকাল সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৫৭ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। হাসপাতালের বাকি শয্যাগুলো জলবসন্ত (চিকেনপক্স) এবং এইচআইভি/এইডসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান বলেন, ‘এখন যেসব শিশু আমাদের কাছে আসছে, তাদের বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের। বেশিরভাগ রোগীকে মুমূর্ষু অবস্থায় এখানে আনা হয়।’
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার জানান, এদের ৭৩ শতাংশই ঢাকার বাইরের। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় গত ১২ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় টিকা শুরু হয়েছে আরও পরে। সম্ভবত এ কারণেই ঢাকার ভেতরের শিশু হাসপাতালে কম আসছে।’
ঢাক শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, হাম নিয়ে আগে তারা কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। গতকাল তাদের হাসপাতালে ৮৫ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ফলে নিয়মিত ও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে এটাই মূল কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমান সরকার এখন জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি চালাচ্ছে।
অধ্যাপক জিয়াউল ইসলাম বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলো থেকে অনেক রোগী অত্যন্ত গুরুতর ও জটিল অবস্থায় ঢাকায় আসছে। অনেক হাসপাতালে এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের ঢাকায় রেফার করছে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের দ্রুত ও ব্যাপক পরিসরে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ নেই। তাই বাধ্য হয়ে তারা রোগীদের ঢাকায় পাঠান। আবার মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে অনেক চিকিৎসক পরিস্থিতি ততটা খারাপ না হলেও রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।
তা ছাড়া কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই আইসিইউ নেই। এমনকি প্রায় ২০টি জেলার সরকারি হাসপাতালেও আইসিইউ সুবিধা নেই। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ চিকিৎসকদের কাছে খুবই সীমিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, অভিভাবকেরা আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় বাচ্চাদের ঢাকার হাসপাতালগুলোতে নিয়ে আসছেন।
তিনি জানান, রোগী রেফার করা এবং প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে আজ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর সব পরিচালক এবং শিশু বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক হবে। তিনি বলেন, এই বৈঠক থেকে কিছু নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
