পজিটিভ প্যারেন্টিং কী, যা জানা দরকার

অনেক বাবা-মা আবার পজিটিভ প্যারেন্টিং করতে চান। তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে, এটা নিজে নিজে হয়ে যায়। বরং এজন্য কিছু নিয়ম মানতে হয় এবং শেখা ও অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়।
স্টার অনলাইন ডেস্ক

সব বাবা-মায়েরা চান, তাদের সন্তান আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। এজন্য তারা নানা উপায় মেনে চলেন। অনেক বাবা-মা আবার পজিটিভ প্যারেন্টিং করতে চান। তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে, এটা নিজে নিজে হয়ে যায়। বরং এজন্য কিছু নিয়ম মানতে হয় এবং শেখা ও অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়।

পজিটিভ প্যারেন্টিং সলিউশনসের প্রতিষ্ঠাতা এবং “দ্য ‘মি, মি, মি’ এপিডেমিক” বইয়ের লেখক অ্যামি ম্যাকক্রেডি বলেন, শিশুর পৃথিবীকে সুন্দর করতে পজিটিভ প্যারেন্টিং শুরু করা দরকারি। কিন্তু বেশিরভাগ অভিভাবক সমস্যায় পড়ার পর এই পথে আসেন।

তার ভাষ্য, রেস্টুরেন্টে চাকরির জন্য মানুষ ‘চিকেন স্যান্ডউইচ বানাতে’ অনেক প্রশিক্ষণ নেয়। কিন্তু বাবা-মা হওয়ার পর সন্তানকে লালনপালনের জন্য তেমন কোনো প্রশিক্ষণ নেয় না। এ কারণে বেশিরভাগ বাবা-মা সন্তানের সমস্যায় নিজেদের মতো করে প্রতিক্রিয়া দেখান। যা অনেক সময় শিশুর সমস্যা সমাধানে খুব একটা কাজে লাগে না।

তিনি বলেন, পজিটিভ প্যারেন্টিং কোনো ট্রেন্ড নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা নিয়মিত অনুশীলন করতে হয়। এর অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ ও ‘অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং’ এর মাঝামাঝি।

তিনি পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের চারটি নীতির কথা বলেন। নিচে এগুলো তুলে ধরা হলো।

আচরণ হলো যোগাযোগের মাধ্যমে, এমনকি ‘খারাপ’ আচরণও

ম্যাকক্রিডি বলেন, পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের মূল ধারণা হলো শিশুর সব আচরণই এক ধরনের যোগাযোগ। আমরা যেটাকে খারাপ আচরণ বলি, সেটাও অনেক সময় শিশু কোনো প্রয়োজন থেকে করে।

তিনি বলেন, শিশু কেমন আচরণ করছে এবং কেন করছে সেটা বুঝতে পারাই পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের প্রথম ধাপ। সাধারণত শিশুর বিভিন্ন আচরণের পেছনে তিনটা কারণ থাকে—সময় চাওয়া, নিয়ন্ত্রণ ও কোনো কিছুর ঘাটতি।

অনেক শিশুর আচরণ দেখে মনে হতে পারে, সে অভিভাবকের কাছাকাছি থাকতে চায়। এটাতে বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই। সে আসলে বলতে চায়, ‘আমি আরও সময় চাই। তোমাদের কাছাকাছি থাকতে চাই।’

আবার অনেক শিশু কথা শোনে না। বাবা-মা যা বলে তার উল্টো করে। অনেক সময় এর মানে দাঁড়ায়, ‘আমার এখন বয়স হয়েছে। আমি নিজের জীবনে একটু বেশি নিয়ন্ত্রণ চাই।’

কেউ কেউ রেগে যায় বা ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া করে। সাধারণত এমন করার কারণ হলো, সে এখনো রাগ নিয়ন্ত্রণ বা সমস্যার সমাধান শিখে ওঠেনি। সুতরাং সে অবাধ্য হয়ে এটা করছে, এভাবে ভাবা ঠিক হবে না। মাথায় রাখতে হবে, ওই দক্ষতা সে এখনো আয়ত্ত করতে পারেনি।

শাস্তি নয়, শেখানো ও সমাধান

ম্যাকক্রিডি বলেন, শিশু যে আচরণ এখনো শেখেনি, অনেক অভিভাবক তার জন্য শাস্তি দেন। কিন্তু পজিটিভ প্যারেন্টসরা শাস্তির বদলে সেই দক্ষতা শেখান এবং সম্ভাব্য সমস্যাগুলো আগে থেকেই কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন।

এই পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

অতিরিক্ত প্রশ্রয় নয়, শাস্তিও আছে

পজিটিভ প্যারেন্টিং মানে যা কিছু তাই করতে দেওয়া বা সবকিছুতে ছাড় দেওয়া নয়।

ম্যাকক্রিডি বলেন, ‘কিছু জেন্টল প্যারেন্টিং মতবাদে বলা হয়, আত্মসম্মান ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু পজিটিভ প্যারেন্টসরা বিশ্বাস করে, বাস্তব জীবনে দায়িত্ব, জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শুধু তাই নয় বারবার এগুলোর ব্যত্যয় হলে অবশ্যই ফল ভোগ করতে হবে।’

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, অনেক শিশু অতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বা এটাতে আসক্ত হয়ে পড়ে। তাহলে তার জন্য এই সুবিধা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হবে।

অবশ্য পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের শাস্তি কখনোই অপমানজনক, লজ্জাজনক বা প্রতিশোধমূলক হয় না। এগুলো আগে থেকে পরিষ্কারভাবে শিশুকে জানানো হয় এবং শেখার সুযোগ দেওয়া হয়, জানান তিনি।

কেবল শিশুর নয়, বাবা-মায়েরও বিষয়

পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, বাবা-মা নিজের আচরণও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। মানে সবসময় শিশুর সব আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে আগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

ম্যাকক্রিডি বলেন, এর মানে হলো শিশুকে কিছু বলার বা ঠিক করার আগে নিজেকে ঠিক করা।

তিনি বলেন, এতে বাবা-মা বুঝতে শেখে, তারা কী কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন শিশুর কথা বলার ধরন, তারা যা বলছে সেটা ঠিকভাবে বলা, তাদের প্রত্যাশা ইত্যাদি।

শেষ কথা, পজিটিভ প্যারেন্টিং বাবা-মাকে কেবল শিশুর সমস্যা সামলাতে সাহায্য করে না। বরং ভবিষ্যতের জন্য তাকে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।

সূত্র: টুডে.কম