শিক্ষক-অবকাঠামো সংকট কাটেনি, তবু নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট ও দুর্বল অবকাঠামো বহুদিনের সমস্যা। এর মধ্যেই বর্তমান মেয়াদে প্রথম সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে বিএনপি সরকার। শুধু তাই নয়, আরও সাতটি নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বিদ্যমান সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট এতটাই তীব্র যে, গত বছর মূল্যায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১৪টি কলেজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৪ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। এর ফলে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮টিতে।

স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই কলেজটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে।

তবে এই অনুমোদনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুসরণ করা হয়নি।

গত বছরের মে মাসে জমা দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন কোনো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ২০টি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর অনেকগুলোর অনুমোদনই রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, নিজ এলাকায় একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের চিকিৎসকেরা আসবেন এবং সেটি দলীয় সাফল্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হবে।

তৎকালীন সরকার ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আরও ১ হাজার ৩০টি আসন বাড়িয়েছিল। কিন্তু শিক্ষক, অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষক ও অবকাঠামোর ঘাটতি চিকিৎসাশিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের স্বাস্থ্যখাতে।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আগের এই সম্প্রসারণ নীতির কঠোর সমালোচনা করে। শিক্ষার মান বজায় রাখতে তারা আসন সংখ্যা যৌক্তিক করার উদ্যোগ নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের নভেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ৩৫৫টি আসন কমিয়ে দেয়। যদিও অন্য কিছু জায়গায় নতুন আসন বরাদ্দ দেওয়ায় মোট আসন কমে ২৮০টি হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারও চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুন্সীগঞ্জে নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দেয়। শর্ত ছিল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পরই সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ওই জেলার বাসিন্দা অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা এই অনুমোদন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এরপর গত ২২ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানান, সরকার আরও সাতটি জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি তালিকায় আরও একটি জেলা যুক্ত হয়েছে। ফলে ঠাকুরগাঁওসহ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটটিতে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) একটি দল ইতোমধ্যে নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজের মূল্যায়ন প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

তবে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিবেদনটি ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া শেরপুর, লক্ষ্মীপুর, নাটোর, ভোলা ও জয়পুরহাটে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাবও মূল্যায়নের জন্য ডিজিএমইকে পাঠানো হয়েছে।

জয়পুরহাট ছাড়া বাকি সব প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ডিজিএমই সূত্র জানায়, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন।

পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর লক্ষ্মীপুরের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানিও এ বিষয়ে তৎপরতা চালান।

একইভাবে নাটোর মেডিকেল কলেজের প্রস্তাবের পেছনে ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান, যিনি নাটোরের বাসিন্দা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। পরে জেলার নতুন সংসদ সদস্যরাও এ প্রস্তাবকে সমর্থন দেন।

অন্যদিকে জয়পুরহাট মেডিকেল কলেজের প্রস্তাবের পেছনে রয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই একমাত্র নতুন প্রস্তাব।

নরসিংদী, শেরপুর ও ভোলার প্রস্তাব এসেছে স্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। এর মধ্যে নরসিংদী বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলা।

ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজের জন্য স্থানীয় একটি সংগঠন আবেদন করেছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল বলেন, মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিতে একটি শক্তিশালী টিম কাজ করছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

ঠাকুরগাঁও বিএনপি মহাসচিবের নিজ জেলা হওয়ায় এটি রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এখানে কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্র নেই। ঠাকুরগাঁও দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত এলাকা, সেই দিকগুলো বিবেচনা করেই এই মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

ডিজিএমই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমোদনের আগে ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন করা হয়েছিল।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ না মানার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের প্রয়োজন নেই, কারণ ডিজিএমই নিজেই অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থা।

গত রোববার দ্য ডেইলি স্টারকে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। তাই আরও মেডিকেল কলেজ প্রয়োজন।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—নতুন মেডিকেল কলেজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামো কোথা থেকে আসবে?

ডিজিএমইর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মোট শিক্ষক পদের ৪৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বর্তমানে শূন্য।

সবচেয়ে বড় সংকট অধ্যাপক পদে, যেখানে ৬৮ দশমিক ৬১ শতাংশ পদই খালি। এছাড়া সহযোগী অধ্যাপকের ৫০ শতাংশ এবং সহকারী অধ্যাপকের ৫১ শতাংশ পদও শূন্য রয়েছে।

নেত্রকোণা, নওগাঁ, নীলফামারী, মাগুরা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও রাঙ্গামাটি—এই সাতটি নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরও তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি।

স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক এম মোজাহেরুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আগের সরকারগুলো অপরিকল্পিতভাবে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে।

নতুন মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এটি কি কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক এই আঞ্চলিক উপদেষ্টা বলেন, সরকারের উচিত ছিল আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য স্বাস্থ্যখাতের জনবল চাহিদা মূল্যায়ন করে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করা। এমন পরিকল্পনা ছাড়া নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।

যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমুল হোসেন বলেন, রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।

তিনি জানান, বাকি পাঁচটি মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ২০২২ সালে তৈরি করা হয়েছিল। এখন সেগুলো সংশোধন করা হচ্ছে এবং দ্রুত অনুমোদনের আশা করা হচ্ছে।

শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যদিও তাদের পদায়ন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

পদায়ন সম্পন্ন হলে মৌলিক কিছু বিষয় ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বর্তমানে দেশে ৩৮টি সরকারি ও ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়।