আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু কেন হলো? তদন্তে যা পাওয়া গেল
রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি ৬ নবজাতকের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ বের করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটি সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় পর্যালোচনা করেছে।
বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দায়িত্বরত নার্স-স্টাফদের অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগামী রোববারের মধ্যেই সরকার হাসপাতালটির বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তদন্তের বিষয়
মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে গত ২৭ মে ভোরে কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে পর্যবেক্ষণে থাকা ৬ নবজাতকের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি মূলত ৬টি বিষয় পর্যালোচনা করেছে।
প্রথমত, খতিয়ে দেখা হয়েছে যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটি অপারেশন পরবর্তী রোগী ও নবজাতক শিশুদের জন্য যথোপযুক্ত ছিল কি না।
কমিটি দেখতে পেয়েছে, ওয়ার্ডটি চারদিক থেকে আবদ্ধ এবং বাইরে থেকে আলো-বাতাস প্রবেশের সুযোগ ছিল না। আরও দুটি কক্ষ পার হয়ে ওই ওয়ার্ডে ঢুকতে হয়। ভেতরের পরিবেশ গুমোট এবং এসি যথেষ্ট পুরোনো ও কক্ষের আয়তনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
প্রায় ৯০০ বর্গফুটের ওয়ার্ডে ৫ টনের এসি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেছে তদন্ত কমিটি। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় এবং এসি রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বন্ধ থাকায় নবজাতকদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয় বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।
দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল অস্ত্রোপচার বা সিজার প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া নবজাতকদের প্রসব-পরবর্তী বিশেষ চিকিৎসা বা ইনিকিউবেটরে স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না। এছাড়া, নবজাতকদের জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কোনো বিশেষ পরামর্শ ছিল কি না, তাও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। তারা দেখেছেন, মৃত নবজাতকরা অপারেশনের পর চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে শারীরিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল।
প্রসব-পরবর্তী জটিলতায় কাউকে ইনকিউবেটরে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। এছাড়া, কোনো শিশুর জন্যই শারীরিক ত্রুটিজনিত চিকিৎসকের বিশেষ নির্দেশনা বা পরামর্শ ছিল না।
তৃতীয়ত, দেখা হয়েছে যে ওই ওয়ার্ডের জন্য কোনো চিকিৎসক বা বিশেষায়িত চিকিৎসক দায়িত্বরত ছিলেন কি না।
তদন্ত কমিটি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা প্রায় ৫০ জন রোগীর জন্য দায়িত্বরত কোনো চিকিৎসক ছিলেন না।
এছাড়া, শিশুরা অসুস্থ হওয়া থেকে শুরু করে ভোর ৬টায় মুমূর্ষু অবস্থায় যাওয়া পর্যন্ত কোনো চিকিৎসককে ডাকা হয়নি এবং কোনো চিকিৎসক তাদের দেখতে যাননি।
চতুর্থ পর্যালোচনার বিষয় ছিল মৃত নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল।
৬ নবজাতকের সবাই জন্মের পর ওই হাসপাতালে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে সুস্থ ছিল। হাসপাতালের রেকর্ডে নবজাতকদের শারীরিক ত্রুটিজনিত বিশেষ কোনো নির্দেশনার উল্লেখ ছিল না বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে নবজাতকদের অস্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে দায়িত্বরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের ভূমিকা কী ছিল, তা দেখা হয়েছে।
এ বিষয়টি যাচাই করতে তদন্ত কমিটি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য বিশ্লেষণ করেছে। এক্ষেত্রে দেখা গেছে, আদ-দ্বীন হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন। নার্সদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীন আচরণের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
সুস্থ নবজাতকদের হঠাৎ করে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপতাল কর্তৃপক্ষ, নিয়োজিত চিকিৎসক বা সেবিকাদের পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্বশীল আচরণের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি।
ষষ্ঠত, হাসপাতালের পরিবেশ ও নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্যও পর্যালোচনা করেছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে, হাসপাতালের অবকাঠামো ৭০০ বেডের হাসপাতাল হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য যথোপযুক্ত নয়। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে একটি বেকারি রয়েছে, যা সঙ্গত নয় বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।
সব মিলিয়ে ওয়ার্ডটি কোনোভাবেই পোস্ট-অপারেটিভ সেবা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ। কমিটি বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন তদন্তে প্রাপ্ত ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
ছয় শিশুর মৃত্যু পেশাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটি নিশ্চিতভাবেই মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা শিশুদের মরদেহ নিয়ে গেছেন। আসামিরা আইনি সুযোগ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এটি রাতের আঁধারে ঘটা কোনো গোপন ঘটনা নয়, এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আদালত আসামিদের কোনো ছাড় দেবেন না।



