ধূমপানের ক্ষতি কেবল ফুসফুসে নয়, বিপদ বাড়ে লিভারেও

প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ও প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ উমর

সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু ধূমপানের ক্ষতি কেবল ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার বা যকৃতও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধূমপান লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং আগে থেকেই লিভারের সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।

বর্তমানে অনেকের মধ্যে ফ্যাটি লিভার বা চর্বি জমার সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এই সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, বেশি তেল-চর্বিযুক্ত খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সম্পর্ক আছে।

অনেকে মনে করেন, কেবল মদ্যপানের কারণেই ফ্যাটি লিভার হয়। কিন্তু মদ্যপান না করলেও লিভারে চর্বি জমতে পারে এবং ধূমপান এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

লিভার শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু লিভারে যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চর্বি জমে যায়, তখন এর কাজ ব্যহত হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভারের শুরুতে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে একজন মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করলেও তার লিভারে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সমস্যা গুরুতর হলে একসময় লিভারে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, এমনকি লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

সিগারেটে হাজারো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে। ধূমপানের সময় এসব পদার্থ শরীরে ঢোকে। এগুলো কেবল ফুসফুসেই আটকে থাকে না, বরং রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও পৌঁছে যায়। লিভারও এর বাইরে নয়।

এছাড়া ধূমপান শরীরের রক্তে শর্করা বা চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে। ফলে শরীরে চিনি ও চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে লিভারসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অতিরিক্ত চর্বি জমার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যাদের আগে থেকেই ফ্যাটি লিভার বা লিভারের অন্য সমস্যা আছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। ধূমপান লিভারের রোগেকে দ্রুত জটিল করে দিতে পারে এবং লিভারে ক্ষত বা দাগ তৈরির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থাৎ, ধূমপান সব সময় লিভারের সমস্যার মূল কারণ না হলেও, আগে থেকেই দুর্বল লিভারের জন্য এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আশার কথা হলো, জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে লিভারের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধূমপান ছেড়ে দেওয়া।

পাশাপাশি লিভার সুস্থ রাখতে অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার কমাতে হবে, বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার কম খেতে হবে, নিয়মিত শাকসবজি ও তাজা ফল খেতে হবে, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করতে হবে এবং লিভারের সমস্যা থাকলে মদ্যপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।

ফ্যাটি লিভারের সমস্যা অনেক সময় নীরবে বাড়তে থাকে। তাই শরীরে ব্যথা বা অন্য কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ভালো। বিশেষ করে যারা ধূমপান করেন, অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন কিংবা আগে থেকেই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত তাদের লিভারের স্বাস্থ্যের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া উচিত।

লেখক:
প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ইন্টারনাল মেডিসিন ও রেসপাইরেটরি মেডিসিন বিভাগের ভিজিটিং অধ্যাপক।

প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ উমর রাওয়ালপিন্ডি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর।