মালদ্বীপের পর ভ্রমণপিপাসুদের নজরে ইন্দোনেশিয়ার যে নির্জন দ্বীপ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের অংশ বাওয়াহ দ্বীপ। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জের নিরিবিলি এলাকায় গড়ে উঠেছে বাওয়াহ রিজার্ভ নামে একটি বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র। 

সন্ধ্যা নামার পর সেখানে অতিথিদের ফোনে জরুরি বার্তা আসতে শুরু করে, ছোট ছোট সামুদ্রিক কচ্ছপ দেখতে সাগরে যাওয়ার সময় হয়েছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বাওয়াহ রিজার্ভকে এমন এক বিলাসবহুল দ্বীপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে অতিথিরা নিরিবিলি অবকাশের পাশাপাশি খুব কাছ থেকে সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের কাজ দেখার সুযোগ পান।

রিসোর্টের তিনজন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করেন, যাতে গিরগিটি বা অন্যান্য প্রাণী সেগুলোকে খেয়ে না ফেলে। পরে রিসোর্টের একটি সৈকতের নিরাপদ, ঢাকনাযুক্ত স্থানে ডিমগুলো নতুন করে সংরক্ষণ করা হয়। সেখানেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সামুদ্রিক কচ্ছপ শত বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। তবে সেই দীর্ঘ জীবন শুরুর আগেই তাদের পাড়ি দিতে হয় কঠিন পথ।

বাওয়াহর বিজ্ঞানীরা এমনভাবে কচ্ছপের বাসা তৈরি করেছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার একটিই পথ। ডিম ফুটে বের হওয়া কচ্ছপগুলো সেই পথ ধরে সাগরের দিকে এগিয়ে যায়। বালুর ওপর তৈরি সরু পথে দুপাশে ছোট দেয়াল থাকায় কচ্ছপগুলো সোজা পানির দিকে যেতে পারে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, জীববিজ্ঞানীরা যখন বুঝতে পারেন কিছু ডিম ফুটেছে, তখন রিসোর্টের কর্মীরা অতিথিদের বার্তা পাঠান। উদ্দেশ্য, সৈকতে গিয়ে কচ্ছপের সাগরে যাওয়ার দৃশ্য যেন সবাই দেখতে পান। অনেক অতিথিই তখন রাতের খাবার ফেলে কিংবা গোসলের পানি ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষা না করেই সৈকতের দিকে ছুটে যান।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অতিথিরা এই দৃশ্য দেখা এবং ভিডিও করার জন্যই হাজার হাজার ডলার খরচ করেন।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে। রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ সেই বিশাল দ্বীপমালার উত্তরাঞ্চলের একটি অংশ। সমুদ্রের মধ্যে মালার মতো ছড়িয়ে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জের ছয়টি দ্বীপের মালিক বাওয়াহ রিসোর্ট। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের একটি নিরিবিলি অংশে গড়ে উঠেছে তাদের নিজস্ব একান্ত অবকাশকেন্দ্র।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, বাওয়াহ রিজার্ভে যেতে সাধারণত যাত্রা শুরু হয় সিঙ্গাপুর থেকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অতিথিরা প্রথমে সিঙ্গাপুরের হোটেলে ওঠেন। এরপর সকাল ৭টায় কালো রঙের গাড়িতে করে তাদের নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরের একটি ফেরিঘাটে। পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ শেষে ফেরিতে করে সিঙ্গাপুর প্রণালি পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জেরই অংশ ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে।

সেখান থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে করে অতিথিদের নেওয়া হয় বাতামের হাং নাদিম বিমানবন্দরে। সাধারণ যাত্রীদের ভিড় এড়িয়ে তারা সরাসরি রানওয়েতে থাকা একটি ব্যক্তিগত জলবিমানে ওঠেন।

একেকটি জলবিমানে সর্বোচ্চ ১০ জন যাত্রী যেতে পারেন। বাওয়াহে যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য এমন দুটি বিমান রয়েছে, একটি নীল ও অন্যটি সবুজ। বিমানে মালপত্রের পরিমাণও কঠোরভাবে সীমিত। প্রত্যেক অতিথি সর্বোচ্চ ১৫ কেজি মালপত্র নিতে পারেন। বিমানে ওঠার আগে যাত্রী ও তার ব্যাগের সম্মিলিত ওজনও পরীক্ষা করা হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে যারা বাওয়াহে যান, তারা চাইলে বাতামের ফেরিঘাটে অতিরিক্ত মালপত্র রেখে যেতে পারেন। কম মালপত্র নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সহজ করতে রিসোর্ট থেকেই দেওয়া হয় সানস্ক্রিন, শ্যাম্পু, কটন বাড, বাথরোব, রোদ ঠেকানোর টুপি, সৈকতের তোয়ালে, এমনকি পোশাকও।

বাতাম থেকে উড্ডয়নের প্রায় ৭৫ মিনিট পর জলবিমানটি বাওয়াহর সরু একটি জেটির পাশে পানিতে অবতরণ করে। সেখানে ইউনিফর্ম পরা কর্মীরা অতিথিদের স্বাগত জানান এবং ঠান্ডা তোয়ালে এগিয়ে দেন।

রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ ইন্দোনেশিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। জাকার্তার চেয়ে এই দ্বীপপুঞ্জ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি। বাতাম এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত দ্বীপগুলোর একটি। তবে পুরো এলাকায় আরও অনেক জনমানবহীন দ্বীপ রয়েছে। এসব দ্বীপে দাগি ঘুঘু, ফলখেকো বাদুড় এবং ব্ল্যাকটিপ রিফ হাঙর দেখা যায়।

দীর্ঘ যাত্রার পর বাওয়াহর সবুজ, শান্ত পরিবেশে পৌঁছালে বাইরের পৃথিবীকে ভুলে যাওয়া সহজ। ব্যক্তিগত বাটলাররা অতিথিদের তাদের স্যুটে পৌঁছে দেন। কক্ষের বাইরে হাতে খোদাই করা কাঠের বোর্ডে অতিথির নাম লেখা থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে না চাইলে দ্বীপজুড়ে ওয়াই-ফাই রয়েছে। তবে রিসোর্ট থেকে এমন সাধারণ ফোনও দেওয়া হয়, যেগুলো শুধু কনসিয়ার্জের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যায়।

এই বিলাসবহুল অভিজ্ঞতার খরচও কম নয়। বাওয়াহর সবচেয়ে সাধারণ কক্ষের ভাড়া শুরু ১ হাজার ৯৮০ ডলার থেকে। দ্বীপে যাওয়া-আসার জটিলতার কারণে কমপক্ষে তিন রাত থাকতে হয়।

এই খরচের মধ্যে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার এবং একটি স্পা সেবা রয়েছে। তবে অতিথিরা চাইলে আরও খরচ করে ব্যক্তিগত সৈকতভোজের আয়োজন করতে পারেন, যার খরচ এক হাজার ডলার। চাইলে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় এবং ৪৫ মিনিটের বদলে ৯০ মিনিটের স্পা সেবাও নেওয়া যায়।

সবচেয়ে সাধারণ থাকার ব্যবস্থা হলো বাগানের মধ্যে তাঁবুর মতো স্যুট। আর সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো চার শয়নকক্ষের একটি স্যুট, যেখানে রয়েছে নিজস্ব ইনফিনিটি পুল। ভরা মৌসুমে এর ভাড়া ১২ হাজার ৩০০ ডলার।

আরও বিলাসবহুল অভিজ্ঞতার জন্য বাওয়াহর আরেকটি দ্বীপ পুরোপুরি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখানে থাকার পাশাপাশি পুরো দ্বীপের কর্মীরাও অতিথিদের জন্য নিয়োজিত থাকেন।

রিসোর্টটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পল রবিনসন সিএনএনকে বলেন, বাওয়াহ এমন অতিথিদের জন্য তৈরি, যারা ‘মালদ্বীপে বিরক্ত’। তার মতে, মালদ্বীপের রিসোর্টগুলো বিলাসবহুল পানির ওপর নির্মিত বাংলো এবং কিছু না করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ। তবে ধনী হলেও সক্রিয় জীবনযাপন পছন্দ করেন এমন অতিথিদের জন্য বাওয়াহ আরও বেশি কর্মকাণ্ডের সুযোগ রাখে।

রবিনসনের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে কফি সংগ্রহ ও সুগন্ধি তৈরির কর্মশালা। পাশাপাশি রয়েছে স্নরকেলিং, খোলা সাগরে সাঁতার ও স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো জলভিত্তিক নানা আয়োজন।

এছাড়াও প্রতিদিন পানির ওপর তৈরি ছোট একটি বাংলোয় যোগব্যায়ামের ক্লাস হয়। সেখানেই রয়েছে ব্যায়ামের সরঞ্জাম ও ভারোত্তোলনের ব্যবস্থা। কেউ নিজের কক্ষেই ব্যায়াম করতে চাইলে কর্মীরা দ্বীপজুড়ে চলাচল করা গলফ কার্টে করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেন।

যাত্রার আগেই শুরু হয় প্রস্তুতি

সিএননের প্রতিবেদনে বাওয়াহর বিলাসিতাকে এমন এক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে সবকিছু খুব যত্নে সাজানো হলেও কোনো কিছুই অতিরিক্ত সাজানো মনে হয় না। এখানে সোনার কল বা বড় বড় ব্র্যান্ডের লোগোযুক্ত বিছানার চাদরের বদলে রয়েছে স্থানীয় ইন্দোনেশীয় কাঠে তৈরি বাথটাব এবং সিলিং ফ্যানের নিচে নরম রেশমি কাপড়ে সাজানো বিছানা।

অতিথিদের চেক-ইনের এক সপ্তাহ আগে তাদের ঘুমের অভ্যাস থেকে শুরু করে খাবারে অ্যালার্জি পর্যন্ত বিভিন্ন পছন্দের তথ্য দিতে হয়। পরে সেই তথ্য অনুযায়ী পুরো অবস্থানকে ব্যক্তিগতভাবে সাজানো হয়।

কর্মীরা অতিথিদের পছন্দগুলো মনে রাখেন। যেমন কেউ লাল ওয়াইন পছন্দ না করলে তাকে সাদা ওয়াইন দেওয়া হয়। কারও আঙুরফলে অ্যালার্জি থাকলে তার ফলের সালাদে সেটি রাখা হয় না। রাতে পছন্দের স্বাদের চকোলেট বা মিষ্টিও উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

স্থানীয় উপাদান ও সামুদ্রিক খাবারনির্ভর খাবারের সঙ্গে প্রতিদিন রিসোর্টে তৈরি কমবুচা বা ফলের রস পরিবেশন করা হয়। বারিস্তার তৈরি ফ্ল্যাট হোয়াইট ও ক্যাপুচিনো সবসময় পাওয়া যায়। চাইলে অতিথিরা কক্ষে থাকা যন্ত্রে তাজা কফির দানা গুঁড়া করে নিজেরাই কফি তৈরি করতে পারেন।

সপ্তাহে দুই রাত রিসোর্টের সমুদ্রসৈকতের রেস্তোরাঁটি ইন্দোনেশীয় খোলা বাজারের আদলে সাজানো হয়। এর মাধ্যমে অতিথিরা দ্বীপে পৌঁছানোর পথে যেসব স্থানীয় সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে সরাসরি যেতে পারেননি, তার কিছুটা স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পান।

দ্বীপের ছোট একটি দোকানে পুনর্ব্যবহৃত সমুদ্রের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি সাঁতারের পোশাকসহ নানা পণ্য বিক্রি হয়। সেখানে প্রতিদিন ভিন্ন স্বাদের জেলাটোও পাওয়া যায়, যার স্বাদের তালিকা চকবোর্ডে লেখা থাকে।

দ্বীপের লাইব্রেরিতে ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি ও স্থানীয় উদ্ভিদ নিয়ে তথ্যবহুল বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে থ্রিলার ও হালকা পড়ার বই।

সিএননের ভাষ্য, পুরো অভিজ্ঞতাটিতে ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ সিরিজের মতো বিলাসিতা ও বিচ্ছিন্নতার আবহ থাকলেও, এখানে অঘটনের আশঙ্কা নেই।

ভ্রমণশিল্পে ‘বেয়ারফুট লাক্সারি’ বা খালি পায়ে বিলাসিতার ধারণাটি বেশ প্রচলিত। তবে রবিনসন এই শব্দবন্ধটি পছন্দ করেন না। তিনি সিএনএনকে বলেন, বাওয়াহর সাধারণ অতিথিদের জীবনযাপনের সঙ্গে ধারণাটি কিছুটা মেলে। তারা জীবনের সেরা বিলাসিতা কেনার সামর্থ্য রাখেন, কিন্তু তাদের কাছে চূড়ান্ত বিলাসিতা হলো সবকিছু থেকে দূরে সরে যাওয়া।

এই অর্থে, কচ্ছপের ডিমের জন্য তৈরি নিরাপদ বাসার সঙ্গে বাওয়াহর এই বিলাসী আশ্রয়েরও যেন এক ধরনের মিল রয়েছে। শান্ত, নিরাপদ এবং সারাক্ষণ যত্নে রাখা এই দ্বীপে অতিথিদের জন্য শেষ পর্যন্ত বাকি থাকে শুধু সাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং নিজের মতো করে সময় কাটানো।