ট্রাম্প-জিনপিং সম্ভাব্য বৈঠক: কী কথা তাহার সাথে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

একই দিনে বিশ্ববাসী পেলেন দুটি সংবাদ। এই দুই সংবাদই একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রথম সংবাদে জানা যায়—মহাক্ষমতাধর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদের পাশাপাশি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত চীনের কাছেও সহায়তা চেয়েছেন।

উদ্দেশ্য—সব দেশের সহায়তায় ইরানের হামলা থেকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিকে সব জাহাজ চলাচলের জন্য উপযুক্ত করে তোলা।

দ্বিতীয় সংবাদটি ছিল—ট্রাম্প বলেছেন যে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের আসন্ন সম্মেলন ‘পিছিয়ে’ যেতে পারে। যদিও বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই পক্ষই মার্কিন রাষ্ট্রপতির আসন্ন সফর নিয়ে ‘যোগাযোগ’ করে যাচ্ছে।

আজ ১৭ মার্চ বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়—আগামী ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল বেইজিংয়ে এই দুই নেতার বৈঠক হওয়ার কথা আছে। গত বছর অক্টোবরে এই দুই নেতার সর্বশেষ দেখা হয়েছি।

প্রতিবেদন অনুসারে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন যে ‘রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের চীন সফরের সময় ও আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটন কাজ করে যাচ্ছে।

তবে আলোচনার আগে শর্ত জুড়ে দিয়ে ট্রাম্প বিষয়টি জটিল করে তুলেছেন কিনা তাও ভেবে দেখার বিষয়।

গত ১৫ মার্চ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন যে তার প্রত্যাশা—বেইজিংয়ে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনের আগে হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে গ্রেট হল সহায়তা করবে।

একই দিনে এ প্রসঙ্গে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প সেই সংবাদমাধ্যমটিকে আরও বলেছেন, ‘আমি মনে করি, চীনের উচিত সহায়তার জন্য এগিয়ে আসা। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চীনের মোট তেলের ৯০ শতাংশ আসে।’

চলতি মাসের শেষের দিকে বেইজিংয়ে ট্রাম্পের পূর্ব-পরিকল্পিত সফরের আগে হরমুজ ‘মুক্ত’ করায় সহায়তার বিষয়ে চীনের মনোভাব জানতে আগ্রহী মার্কিন রাষ্ট্রপতি।

এরপর আসন্ন সফর সম্পর্কে ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। জানান, জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক ‘পিছিয়ে যেতে পারে’।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, একইদিনে প্যারিসে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনা উপ-প্রধানমন্ত্রী হি লিফেং বাণিজ্য সম্পর্কিত নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের বৈঠককে ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের পথ পরিষ্কার করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

অথচ, এমন পরিস্থিতিতে খোদ ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার আভাস পাওয়া গেল।

রয়টার্সের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউস ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ দিকে, গত ১৬ মার্চ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়—বাণিজ্য নিয়ে প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্যিক কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেছিলেন। তারা কৃষি, বিরল খনিজপণ্য ও অন্যান্য বিষয় ট্রাম্প-জিনপিংয়ের শীর্ষ সম্মেলনের জন্য তুলে রাখা হতে পারে।

কেননা, দিনশেষে এই দুই শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়গুলো নির্ভর করবে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বছর’

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য চলতি বছরকে গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ ১৭ মার্চ সিএনএন এ তথ্য জানিয়ে বলেছে—ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটন চাচ্ছে বেইজিংয়ে চীনা নেতার সঙ্গে বৈঠক ‘অন্তত ১ মাস’ পিছিয়ে দেওয়া হোক।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প-জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠক পিছিয়ে গেলে তা দুই দেশের জন্যই ‘স্বস্তিদায়ক’ হবে। কেননা, তাদের বৈঠকে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়গুলো এখনো ‘চূড়ান্ত’ করা যায়নি।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকের কথা কখনোই নিশ্চিত করা হয়নি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলা এড়িয়ে যান।

গত ৮ মার্চ তিনি সিএনএন-এর বিশ্লেষক স্টিভেন জিয়াংকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য এ বছরটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক উচ্চ-পর্যায়ের বিষয় আলোচনার টেবিলে আছে।’ এখন দুই পক্ষকেই প্রস্তুতি নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, মত পার্থক্য দূর করার ব্যবস্থা ও যেগুলো অযথা বাধা হয়ে আছে সেগুলো দূর করতে হবে,’ যোগ করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘কী কথা তাহার সাথে?’

গত ১৬ মার্চ রয়টার্সের প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র চীনে ‘জোরপূর্বক শ্রমের’ অভিযোগ তুলে এর নিন্দা করায় চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এ প্রসঙ্গে বেইজিংয়ের বার্তা: ওয়াশিংটনকে ‘নিজের ভুলগুলো শুধরাতে হবে’।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে ‘অর্থবহ’ আলোচনার পাশাপাশি একে অপরের প্রতি আস্থা বাড়াতে হবে, বলে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

আজ ১৭ মার্চ সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়—ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প ও জিনপিং যদি সত্যিই বৈঠকে বসেন তাহলে তারা বাণিজ্য ও নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এসবের সঙ্গে থাকবে শুল্ক। অত্যাধুনিক মাইক্রোচিপ বাজারে চীনের প্রবেশ ও তাইওয়ান নিয়েও দুই শীর্ষ অর্থনীতির দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কথা হতে পারে।

স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে চীন নিজ দেশের অংশ মনে করে এবং দ্বীপটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন চরমে।

কিন্তু, এখনকার বাস্তবতায় বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর ও জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেতে পারে বলেও সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা করা হয়, এই যুদ্ধ সহসা শেষ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল’ ও চীনের ‘সুবিধা’

গত ১১ মার্চ হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক মতামত প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘যেভাবে ইরানকে নিয়ে আমেরিকার ভুল হিসাব চীনকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে’।

এতে বলা হয়, মিত্রদের মতামত না নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে ইরানে ‘প্রতিরোধমূলক’ হামলা চালানোয় ওয়াশিংটনের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়েছে। এমন ঘটনায় শক্তিশালী হচ্ছে বেইজিংয়ের হাত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন স্বার্থে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে ইরান বৈশ্বিক তেল বাজারকে প্রভাবিত করছে।

মতামত প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের সম্ভাব্য পরাজয় বেইজিংয়ের কর্তাব্যক্তিদের মনে যত বড় প্রশ্ন জাগিয়েছে, এর চেয়ে বড় প্রশ্ন—ওয়াশিংটন ইরাক যুদ্ধের পর নতুন করে কোনো ‘চোরাবালিতে’ পা দিচ্ছে না তো?

এতে আরও বলা হয়, ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া বা সব সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা সম্ভব; কিন্তু, তা ধ্বংস পরবর্তী ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আইনি ভিত্তি দিতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আরও বলা হয়—সেখানে বিদ্রোহীরা সংগঠিত ছিল বলে ন্যাটো বাহিনী সহজেই ত্রিপোলিতে বিজয় পায়। কিন্তু, ইরানে এই মুহূর্তে এরকম কোনো বিদ্রোহী বাহিনী নেই, যার মাধ্যমে মার্কিনিরা নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিতে পারে।

জেনেভায় শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অপ্রত্যাশিত হামলা চালিয়ে বসে। শান্তি যখন ‘হাতের কাছে’ তখন এমন যৌথ হামলা মোকাবিলায় ইরানকে দেখা গেল সর্বশক্তি দিয়ে এর প্রতিশোধ নিতে। ফলশ্রুতিতে, ট্রাম্প প্রশাসন যেন বেইজিং ও মস্কোর হাতে আইনি যুক্তির ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, বলে প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

চীন তার নিজের ‘হিসাব’ মতো এগিয়ে যাচ্ছে, উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, ২০২৭ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শত বছর পূর্তিকে সামনে রেখে বাহিনীটিকে সাংগঠনিকভাবে সুসংহত করে চলেছে।

এ প্রসঙ্গে পিএলএ-র একটি বার্তা সবার জন্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়—‘শান্তি আসমান থেকে পড়ে না। প্রার্থনা করে যুদ্ধ থামানো যায় না। জঙ্গলের আইন কখনই হারিয়ে যায়নি।’

আবার ফিরে আসা যাক হরমুজ প্রসঙ্গে। এই প্রণালিটি ইরানের ‘প্রভাব মুক্ত’ রাখতে চীনের সহায়তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত ১৩ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ট্রাম্পের অঘটনের ফলে চীন বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। চীন বিদ্যুৎকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তাই তেলের বাজার নিয়ে বেইজিং আতঙ্কিত নয়।

এরই অনুরণন যেন শোনা গেল গত ১৬ মার্চ সিএনএন-এর এক ভিন্ন প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দূরত্ব কমিয়ে নেওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল তাও যেন মিইয়ে যাচ্ছে। কেননা, ট্রাম্প এর সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ইরানের হাত থেকে হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার শর্ত।

তবে ট্রাম্পের দাবি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের আগ্রহ খুব একটা নেই বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

অপর এক সংবাদ প্রতিবেদনে জানা যায়, চলতি মার্চের শেষে বেইজিংয়ে সম্ভাব্য বৈঠক ছাড়াও এ বছরে আরও দুইটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেখা ও বৈঠকের সম্ভাবনা আছে।

তবে দেখার বিষয়—বাণিজ্যের পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গে জিনপিংয়ের আসলে আর কোন বিষয় নিয়ে আর কী কথা হয়।