পল্টনে সত্যজিৎ রায়: এর চেয়ে বড় সম্মান কখনো পাইনি
বাংলাদেশ তখন স্বাধীন ও সার্বভৌম। ১৯৭২ সালে মুক্ত স্বদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে শহীদ দিবস। এ উপলক্ষে বেশ কয়েকজন ভারতীয় শিল্পী, সাহিত্যিক ও চিত্রপরিচালক আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এসেছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ও।
আজ বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের জন্মজয়ন্তী, যিনি তার সৃজনশীলতায় বাংলা চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী ১৯৭২ সালে এসেছিলেন তার পূর্বপুরুষের ভিটা, বাংলাদেশে।
পল্টন ময়দানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আয়োজনে শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন সত্যজিৎ রায়। আজীবন নিজের আবেগ সংবরণ করে রাখা এই মানুষটি নিজের পিতৃভূমিতে এসে আর স্থির থাকতে পারেননি।
তার বক্তব্যে ঝরে পড়েছিল মাতৃভাষা বাংলার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অসীম মমত্ববোধের কথা। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন শৈশবে ঢাকা ভ্রমণে তার স্মৃতির কথা। বলেছিলেন এদেশের প্রতি তার অসীম কৃতজ্ঞতার কথা।
বক্তব্যের শুরুতেই সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘বহুদিন থেকে শহীদ দিবসের কথা শুনে আসছি। একুশে ফেব্রুয়ারির কথা শুনে আসছি। কিন্তু এখানে এসে নিজের চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না আপনারা বাংলা ভাষাকে কতখানি ভালোবাসেন। বাংলা ভাষা যখন বিপণ্ন, তাকে বাঁচানোর জন্য যে সংগ্রাম হয়েছিল, তাতে যারা আত্মোত্সর্গ করেছেন তাদের যে কতখানি শ্রদ্ধা করেন আপনারা, সেটা আমি আজকে এখানে এসে বুঝতে পারছি।’
পশ্চিমবঙ্গের ভাষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকি, আমরাও বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি। এটা ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির মধ্যে আরও পাঁচ রকম সংস্কৃতির প্রভাব এসে পড়ায় সেটাকে একটা পাঁচমিশালি ভাব এনে দিয়েছে। ইংরেজির প্রভাব আমরা এখনও পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তার একটা কারণ বোধহয় এই যে, পশ্চিমবঙ্গ হলো ভারতবর্ষের একটা প্রাদেশিক অংশমাত্র। কিন্তু তাই বলে এই নয় যে, আমরা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি না। বাংলা সাহিত্য, বাংলা গান, বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলা থিয়েটার—এসবই পশ্চিমবঙ্গে এখনও বেঁচে আছে, টিকে আছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিমচন্দ্র, শরত্চন্দ্র এদের আমরা এখনো ভালোবাসি।’
জীবনে ভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের অসংখ্য প্রস্তাব পেলেও কেন বাংলাকেই সর্বাগ্রে রেখেছেন, তার বর্ণনায় সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি যে, আজ ২০ বছর ধরে বাংলা ছবি করছি। এর মধ্যে বহুবার বহু জায়গা থেকে অনুরোধ এসেছে যেন আমি বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করে অন্য দেশে, অন্য ভাষায় চিত্র রচনা করি। কিন্তু আমি সেই অনুরোধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ আমি জানি, আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে ভাষা হলো বাংলা ভাষা। আমি জানি যে সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কিছু করতে গেলে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, আমি কূলকিনারা পাব না, শিল্পী হিসেবে আমি মনের জোর হারাব।’
বাবা সুকুমার রায়ের মতো সত্যজিৎ রায়ের জন্মও কলকাতাতে। তবে সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গে তথা বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলায় মসুয়া গ্রামে। এই গ্রামেই জন্ম সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর। ফলে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে নিবিড় এক যোগাযোগ ছিল সত্যজিতের।
সেই স্মৃতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি যে পূর্ববঙ্গ নাকি আমার দেশ। আমার ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায়ের নাম হয়তো আপনারা কেউ কেউ শুনেছেন। আমার তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু শিশুকাল থেকে আমি তার রচিত ছেলে ভোলানো পূর্ববঙ্গের কাহিনী “টুনটুনির বই” পড়ে এসেছি, ভালোবেসে এসেছি। তার রচিত গানে আমি পূর্ববঙ্গের লোকসংগীতের আমেজ পেয়েছি। যদিও আমি এ দেশে আসিনি, আমার দেশে আমি কখনো আসিনি বা স্থায়ীভাবে আসিনি। এসব গান, এসব রূপকথা শুনলে আমার মনে হতো যে এ দেশের সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ রয়েছে।’
শৈশবে ঢাকা ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করে সত্যজিৎ বলেন, ‘যখন আমার পাঁচ কি ছয় বছর বয়স, তখন আমি একবার ঢাকা শহরে এসেছিলাম। দু-তিন দিন মাত্র ছিলাম। আমার মামার বাড়ি ছিল ওয়ারীতে, র্যাংকিং স্ট্রিটে। সে বাড়ি এখন আছে কি না জানি না। সে রাস্তা এখন আছে কি না জানি না। বাড়ির কথা কিছু মনে নেই। মনে আছে শুধু যে প্রচণ্ড বাঁদরের উপদ্রব। বাঁদর এখনও আছে কি না, তা-ও আমি জানি না। তারপর মনে আছে পদ্মায় স্টিমারে আসছি। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গেছে, মা আমাকে বাইরে ডেকে এনে দেখাচ্ছেন যে পদ্মার ওপর সূর্যোদয় হয়েছে। আর দেখাচ্ছেন যে পদ্মা ও মেঘনার জল যেখানে এসে মিশেছে, সেখানে এক নদীর জলের রঙের কতো তফাত। সেই থেকে বারবার মনে হয়েছে যে একবার নিজের দেশটা দেখে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সে আশা, বিশেষত দেশ বিভাগের পর ক্রমেই দুরাশায় পরিণত হতে চলেছিল। হঠাৎ কিছুদিন আগে ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেল। আমার কাছে আমার দেশের দরজা খুলে গেল এবং আজ শহীদ দিবসে এসে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে।’
ঢাকায় এসে নিজের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে উল্লেখ করে সত্যজিৎ রায় বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ঢাকা শহরে এসে আমার স্বপ্ন অন্তত কিছুটা অংশে সফল হলো। এবার আমি অনেক জরুরি কাজ রেখে চলে এসেছি। এবার আর বেশি দিন থাকা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমার ইচ্ছা আছে, আমার আশা আছে, অদূর ভবিষ্যতে আমি আবার এ দেশে ফিরে আসব। এ দেশটাকে ভালো করে দেখব। এ দেশের মানুষের সঙ্গে এমনভাবে জনসভায় নয়, সামনাসামনি, মুখোমুখি বসে কথা বলে তাদের সঙ্গে পরিচয় করব। এ আশা আমার আছে। আমি আর বিশেষ কিছু বলতে চাই না। সংগীতের অনুষ্ঠান রয়েছে, আপনারা যে আমার কাজের সঙ্গে পরিচিত বা আমার কাজ সম্পর্কে যে আপনাদের কৌতূহল আছে, সে খবর আমি এর আগেই পেয়েছি। কয়েক বছর আগে যখন “মহানগর” ছবি এখানে দেখানো হয়েছিল, তাতে এখানকার জনসাধারণ কী ধরনের আগ্রহ, কৌতূহল প্রকাশ করেছিলেন এবং তার ফলে কী ঘটনার উদ্ভব হয়েছিল, সে খবর আমার কানে যখন প্রথম পৌঁছায়, আমি সে কথা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তারপর এখান থেকে বহু পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তি, বন্ধু আমাকে চিঠি লিখে খবরের কাগজের খবর কেটে পাঠিয়েছিলেন। ছবি কেটে পাঠিয়ে আমাকে জানিয়েছিলেন সে ঘটনার কথা। তখন বিশ্বাস হয়েছিল এবং বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গেছিলাম। আমি ভাবতে পারিনি যে এটা হতে পারে। একজন শিল্পী হিসেবে এর চেয়ে বড় সম্মান, এর থেকে গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।’
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পাওয়া সম্মানের চেয়ে বাংলার মাটিতে সম্মানিত হতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সত্যজিৎ রায়। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গত ২০ বছরে অনেক জায়গায় অনেক দেশে অনেকবার নানাভাবে সম্মানিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু জোর গলায় আজকে এখানে দাঁড়িয়ে এই শহীদ দিবসের পূণ্য তিথিতে আমি বলতে পারি যে, আজকের যে সম্মান, সে সম্মানের কাছে আগের সমস্ত সম্মান হার মেনে যায়। এর চেয়ে বড় সম্মান আমি কখনো পাইনি। আর আমার মনে হয় না, আমি আর কখনো পাব। জয় বাংলা।’
সে সফরে সত্যজিৎ রায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এসময় একসঙ্গে তারা বেশ কিছুটা সময় কাটান।
সেই সফর নিয়ে মাসিক ‘উল্টারথ’ পত্রিকার ১৯৭২ সালের মার্চ সংখ্যায় ‘ঢাকার ডায়েরি’ নামে দিনলিপি লিখেছিলেন কলকাতার সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। একই সংখ্যায় চলচ্চিত্র সাংবাদিক বিমল চক্রবর্তী ‘ঢাকা থেকে লিখছি’ নামে একটি নিবন্ধ রচনা করেন।
সেখানে এক জায়গায় বিমল চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, মনের আবেগে কত কথাই তো এই চিঠিতে লিখে চলেছি। কলম আমার কিছুতেই থামতে চাইছে না। আজ আবার এই ঢাকায় বসেই স্বনামধন্য সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাও আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির বাসভবনে। সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে আরও অনেকে এলেন। শহীদ দিবসে ঢাকার ছাত্রলীগ যাঁদের নিমন্ত্রিত করে এনেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকে এসেছিলেন। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে শুধু একজন ঢাকায় আসতে পারেননি, তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘একটুখানি হাসির গুঞ্জরণ। একে একে প্রত্যেকে একটি করে গান শোনালেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু সবার প্রশংসাতেই সমান পঞ্চমুখ। শ্যামল মিত্রকেই দেখলাম সবচেয়ে বেশি কথা বলতে। সত্যজিৎবাবু একরকম চুপচাপই ছিলেন। ফটোগ্রাফার টুলু দাস সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলাদা ছবি তুলতে চাইলেন। শেখসাহেব জবাব দিলেন, “আলাদা কেন, সবাই আসুন, গ্রুপ ছবি তুলি।”’
‘তারপর চায়ের পালা। বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে সকলকে চা পরিবেশন করলেন। চায়ের আসরে ছাত্রলীগ সদস্য ও বাংলাদেশের নামী কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ শেখ সাহেবকে বললেন, “জানেন, পশ্চিম বাংলার এঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামের এই ন’মাস আমাদের জন্যে অনেক করেছেন।” শেখ সাহেব সোজাসুজি জবাব দিলেন, “আমি সব জানি। ওরা তোমাদের জন্যে যা করেছে, সেই ঋণ তোমরা পিঠের চামড়া দিয়েও শোধ করতে পারবে না।”’
সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায় তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবের ঘরে ঢুকে দেখি সত্যজিৎ রায় বসে আছেন। আর গান গাইছেন দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায় আর শ্যামল মিত্র। গানের পর বেশ মজা হলো। একটি মেয়ে গান গাইল। কে একজন পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল, শেখ সাহেব, এ হলো বাংলাদেশের মেয়ে। শেখ হাসতে হাসতে বললেন, তাহলে ওরা কোথাকার? হাসির রোল উঠল। যে বলেছিল, সে বেচারা তো লজ্জায় একেবারে চুপ। গানের পর শেখ সাহেব চা খেতে ডাকলেন। চা খাওয়ার সময় আমি এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিলাম। বললাম, আমি কিছুদিন এখানে আছি। মাঝে মাঝে দেখা হবে। শেখ সাহেব বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই হবে। সন্ধ্যার পর ভাবলাম পল্টন ময়দানের সভায় যাব। কলকাতার শিল্পী-সাহিত্যিকরা এসেছেন। তাদের নিয়ে জনসভা। পরে বিচিত্রানুষ্ঠান। কিন্তু লোকের ভিড়ে এগুতে পারলাম না। প্রায় লাখখানেক লোকের ভিড় সেখানে। চলে এলাম।’
তথ্যসূত্র:
সত্যজিৎ রায়ের প্রবন্ধ সংগ্রহ
বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারি ও বঙ্গবন্ধু: মুয়িন পারভেজ
মাসিক উল্টোরথ: বর্ষ ২১, সংখ্যা ১, চৈত্র, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ, মার্চ ১৯৭২