চাঁদে মানুষ পাঠানোর দৌড়ে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে চীন
২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো, একটি চন্দ্রঘাঁটি তৈরি করা, তারপর মঙ্গল অভিযানের দিকে এগোনো—প্রায় তিন দশক ধরে পরিকল্পনা ও সক্ষমতা গড়ে তুলে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন।
এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা তাদের মানববাহী চন্দ্রমিশন ‘আর্টেমিস ২’-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
চীনের মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচি কী?
১৯৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চীনের মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট ৯২১’ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি এবং একটি মহাকাশ স্টেশন গড়ে তোলা।
২০০৩ সালে প্রথম চীনা মহাকাশচারী ইয়াং লিওয়েইর মহাকাশযাত্রার পর থেকে এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৫টি মানববাহী মিশন পরিচালিত হয়েছে।
২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চীন। এরপর থেকে তারা নিজস্ব কক্ষপথস্থ কেন্দ্র তৈরির দিকে এগোয়। তাই গড়ে তোলা হয় ‘তিয়ানগং’ মহাকাশ স্টেশন, যার অর্থ ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’।
২০২১ সালে প্রথম মহাকাশচারীদের স্বাগত জানায় এই স্টেশন। বর্তমানে সেখানে ‘তাইকোনট’ নামে তিনজন চীনা মহাকাশচারী অবস্থান করছেন।
এই স্টেশন চীনকে স্পেসওয়াক, ডকিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানবদেহে মহাকাশের প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে।
এ পর্যন্ত চীনের কোনো মানববাহী মহাকাশ উৎক্ষেপণ প্রাণঘাতী হয়নি। পুরো কর্মসূচি ধাপে ধাপে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মেনে এগিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড ডি গ্রেইজ এএফপিকে বলেন, ‘এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্থিতিশীল অর্থায়ন এবং পুরো শিল্পখাতকে যুক্ত করার সক্ষমতা।’
তার ভাষ্য, ‘পশ্চিমা পদ্ধতিতে—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্রাধিকার বদলে যায়। সেই তুলনায় চীনের মডেল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর থাকে।’
চীনা মহাকাশচারীরা কবে চাঁদে নামবেন?
চীনের মহাকাশ সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এরই মধ্যে চীন একাধিক রোবট মিশন পাঠিয়ে চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে মানববাহী অভিযানের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের জটিল প্রযুক্তি, যা এখনো পরীক্ষাধীন।
২০২৬ সালে ‘মেংঝো’ বা ‘ড্রিম শিপ’ নামের নতুন মহাকাশযানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পুরোনো ‘শেনঝৌ’ মহাকাশযানের জায়গা নেবে এবং মহাকাশচারীদের চন্দ্রকক্ষপথে পৌঁছে দেবে।
এর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ শক্তিশালী রকেট ‘লং মার্চ-১০’, যা চাঁদের পথে মহাকাশযান পাঠাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মহাকাশচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামাতে সক্ষম ‘লানইউয়ে’ নামের ল্যান্ডার ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও করতে পারে।
চীন কি চন্দ্রঘাঁটি তৈরি করতে চায়?
চীন ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন (আইএলআরএস)’ নামে একটি চন্দ্রঘাঁটির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
এই ঘাঁটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে নির্মিত হবে, যেখানে বরফ আকারে পানির উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটি রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদের মাটি ব্যবহার করে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে ইট তৈরি করে এই ঘাঁটি নির্মাণ করা হতে পারে। পৃথিবী ও ‘তিয়ানগং’ স্টেশনে পরীক্ষিত এই প্রযুক্তি ২০২৮ সালের দিকে ‘চ্যাং’ই-৮’ মিশনে চাঁদে পরীক্ষা করা হবে।
চীনের লক্ষ্য চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং চন্দ্রসম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা। ২০৪০ সালের দিকে এই ঘাঁটির আরও বড় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর পাশাপাশি চাঁদের অদৃশ্য অংশ ও পৃথিবীর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রিলে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরির কাজও চলছে।
এটি কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা?
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চাঁদের দৌড়’ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা বলে না।
মহাকাশ বিশ্লেষক জনাথন ম্যাকডাওয়েল এএফপিকে বলেন, ‘চীন তাদের কর্মসূচিকে স্বাভাবিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র না গেলেও তারা চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করত।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘চীন যদি আগে চন্দ্রঘাঁটি তৈরি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই কাজ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে—কারণ উপযুক্ত জায়গা খুবই সীমিত।’
চীনের মহাকাশ কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ চেন ল্যান বলেন, আপাতত মানববাহী অভিযানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে।
তার মতে, ‘নাসার ড্রাগন ও ওরিয়ন মহাকাশযান এখনো চীনের শেনঝৌর চেয়ে উন্নত। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে চীন নতুন মহাকাশযান ও ল্যান্ডার ব্যবহার করে চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে উঠবে।’
এরপর কি মঙ্গল?
চীনের মহাকাশ সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের পর চন্দ্রঘাঁটি ব্যবহার করে মঙ্গলগ্রহে মানববাহী মিশনের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
চীনের বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মঙ্গলকে ভবিষ্যৎ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন।
চেন ল্যান বলেন, ‘তবে চাঁদে অভিযান ও প্রাথমিক ঘাঁটি নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মঙ্গল নিয়ে বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।’