পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬

বিজেপির গলায় ‘মাছের কাঁটা’?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘হেরে গেলে শেম, শেম’—এ কথা যেন বিজেপির জন্য প্রযোজ্য হয়ে গেছে। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভাকে কেন্দ্র করে। নিন্দুকদের কেউ কেউ উপহাস করে বলেন—‘হেরে গেলে শ্যাম, শ্যাম’!

২০২১ সালে ‘বঙ্গ বিজয়ের’ আশা নিয়ে বিজেপি নির্বাচনে নেমেছিল। কিন্তু, ‘গো-হারা’ হারতে হয়েছিল কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটিকে। এবার ‘বিজয়’ নিশ্চিত করতে দেশটির খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মাঠে নেমেছেন।

গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়—‘ভোটের পশ্চিমবঙ্গে টানা ৭ দিন থাকবেন শাহ! দ্বিতীয় দফার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে গভীর রাতে বৈঠক।’

রাজ্য বিজেপির একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—আগামী ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত কলকাতাতেই থাকবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

এ ঘটনার দুই দিন আগে অর্থাৎ, গত ২০ এপ্রিল একই দৈনিকের শিরোনাম ছিল—‘গোপন বৈঠক ডেকেছেন শাহ, ১৫০ ঘণ্টায় গুরুতর কিছু ঘটানো হবে পশ্চিমবঙ্গে’, দাবি এবং আশঙ্কাপ্রকাশ তৃণমূলের।

‘তৃণমূলের দাবি, ভোটের মুখে এ রাজ্যে আরও কিছু ঘটবে। আর যা হবে কেন্দ্রের অঙ্গুলিহেলনে’—এমনটি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তবে কী ঘটবে বা হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু উল্লেখ করা হয়নি রাজ্যের শাসকদলের তরফে।’

এতে আরও বলা হয়—‘শুধু তাই নয়, গোটা রাজ্য থেকে ৮০০ দলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা করে ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল।’

একটি জেলা থেকে কাকে কাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে সেই তালিকাও আদালতে জমা দিয়েছে রাজ্যের শাসকদল।

তৃণমূলের দাবি—এই তালিকায় দলীয় সদস্য, দলীয় সংসদ সদস্য, বিধায়ক, চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যরাও আছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট হচ্ছে ২৩ এপ্রিল ও দ্বিতীয় দফা ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। প্রথম দফা ভোটে বিজেপির ‘চাণক্য’ হিসেবে ‘পরিচিতি’ পাওয়া অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে থাকবেন। অর্থাৎ, তিনি দেশ চালাবেন পশ্চিমবঙ্গে বসে।

তৃণমূলের অভিযোগ—‘বাংলা দখলের জন্য বিজেপি সব চেষ্টা করছে।’

বাংলার ‘অস্মিতা’ ও বিজেপির ‘রামরাজ্য’

একদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ‘বাংলার মেয়ে’ বলার পাশাপাশি পশ্চিম বাংলার ‘অস্মিতা’ বা অহংকারকে তিনি ভারতবাসীর সামনে তুলে ধরতে চান।

অন্যদিকে, বিজেপি চায়—পশ্চিমবঙ্গে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। অর্থাৎ, কেন্দ্রেও বিজেপি; রাজ্যেও বিজেপি।

তাই, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ বললে, বিজেপির নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন ‘জয় শ্রীরাম’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য: বিজেপি উত্তর ভারতের ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেশের সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চায়। তারা চায় পুরো ভারত ‘হিন্দুত্ব’ মেনে চলবে।

তেরঙা ভারতে গেরুয়ার প্রাধান্য বাড়াতে চায় বিজেপি—এমন মত বিজেপিবিরোধীদের। অর্থাৎ, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত শাসন করতে চায় বিজেপি।

ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়—দেশটির ২৮ রাজ্য ও ৮ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১৩টিতে সরাসরি বিজেপি ও ৬টিতে বিজেপি-জোট সরকার গড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের পুবে আসাম, পশ্চিমে উড়িষ্যা ও উত্তরে বিহার রাজ্য বিজেপিশাসিত। পশ্চিমবঙ্গ এই ‘অপ্রতিরোধ্য’ দলটির কাছে অধরা হয়ে আছে। এবার ‘বঙ্গ বিজয়’ নিশ্চিত করতে চায় নরেন্দ্র মোদির দল।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় এসে ‘সব আসনেই তিনি প্রার্থী’ বলে ভক্তদের উৎসাহ দিয়েছেন। আরও দিয়েছেন, ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।

গত ২৬ মার্চ সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দ-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘রামরাজ্য চাই, হাতে কাজ, পেটে ভাত…, হিন্দু বিরোধীদের বিনাশ’! শোভাযাত্রা থেকে কী বার্তা শুভেন্দুর?

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিরোধীদলের নেতা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী রামনবমীর মিছিল থেকে বলেছেন, ‘রাম রাজ্য চাই। হাতে কাজ, পেটে ভাত, মাথায় ছাদ, সুশাসন, নারী সুরক্ষা চাই। হিন্দু বিরোধীদের বিনাশ, সনাতন বিরোধীদের বিনাশ।’

ভোটের মুখে বিজেপি নেতার এমন বার্তা পশ্চিম বাংলায় আলোড়ন সৃষ্ট করেছে, রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে—বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

এর পরদিন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—ভবানীপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সভায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য: ‘ধর্ম মানে শান্তি। আমরা যেন কাউকে অসম্মান না-করি। চক্রান্ত করে যেন কিছু করতে না পারে।’

এ ছাড়াও, তৃণমূলপ্রধান বারবার বাংলার ‘অস্মিতা’ তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে চলেছেন।

গত ৩০ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বাংলা সংস্করণের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘বিভাজনের রাজনীতি বনান বাঙালি অস্মিতা, ২০২৬-এর মহাযুদ্ধে সুর চড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’

গত ১৫ এপ্রিল একই সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা নববর্ষের উৎসবের আমেজকে কাজে লাগিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি ভোটারদের কাছে পৌঁছে যেতে চেয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনের লড়াইতে ‘বাঙালি অস্মিতা’ ও ‘অধিকার রক্ষার’ ইস্যুকে ফের সামনে নিয়ে এসেছেন।

বাঙালির মাছ-ভাত ও বিজেপির গলায় ‘কাঁটা’

গত ২১ এপ্রিল বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ভারতের রাজনীতিকরা মাছ হাতে নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আসলে কী ঘটছে?’

ঘটনাটিতে যাওয়ার আগে একটু বলে নেওয়া দরকার—বিজেপি হিন্দুত্ববাদ রক্ষার কথা বলায় বিজেপি নেতাদের হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে হয়। সেই চর্চার অংশ হিসেবে বিজেপির শীর্ষ নেতারা নিরামিষভোজী।

শীর্ষ নেতাদের অনুসরণ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির নেতাদের অনেকে অন্য দলের আমিষভোজীদের নিন্দা করেন।

সম্প্রতি, কলকাতার ময়দানে ‘লাখো’ কণ্ঠে গীতা পাঠের অনুষ্ঠান চলাকালে এক মুসলিম হকারকে চিকেন প্যাটিস বিক্রির ‘অপরাধে’ মারধরের ঘটনা ঘটে। তখন বিজেপির কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে আরও আতঙ্ক ছড়ায়।

এমন বাস্তবতায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মুখ্যমন্ত্রী মমতার কথার প্রতিধ্বনি করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন যে, বিজেপি বিধানসভায় বিজয়ী হলে পশ্চিমবঙ্গে ‘মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ’ হবে।

‘অন্তঃসত্ত্বা নারীরা ডিম খেতে পারবেন না’—এমন আশঙ্কাও করছে তৃণমূল।

ফিরে আসা যাক বিবিসির প্রতিবেদনটিতে।
এতে বলা হয়—বাংলা খাবারের অবিচ্ছেদ্য উপাদান মাছ। অর্থাৎ, মাছে-ভাতে বাঙালির সব অনুষ্ঠানে থাকে মাছের উপস্থিতি। নদীমাতৃক অঞ্চল হিসেবে বাংলার পরিচিতি আছে।

এমন একটি দেশের খাদ্যাভ্যাসে গভীরভাবে রাজনীতির রং চাপিয়ে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। নিরামিষ খাওয়াকে ‘নৈতিকার’ সঙ্গেও জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।

বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোয় মাংস বিক্রিতে শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, ‘গো-রক্ষা’র কথা বলে মানুষ হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। যদিও ভারতের বেশিরভাগ মানুষ আমিষভোজী।

গত ২৮ মার্চ ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মাছ অ্যাডো অ্যাবাউট নাথিং’, অর্থাৎ, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অতি আলোচনা।

এতে বলা হয়—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, রাজ্যে বেকারত্ব, রাজ্য সরকারের দুর্নীতি—এসবের পাশাপাশি ‘মাছ’ নিয়ে উচ্চস্বরে আলোচনা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ‘বহিরাগত’ দল হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারী বিজেপির নেতারা বাঙালির সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।

এমনকি, বিজেপির নেতারা বাংলার মনীষীদের নানাভাবে অপমান করছে—এমন অভিযোগও করছেন তিনি।

এর প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে।

গত ২১ এপ্রিল সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়—‘বাংলার নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি “মাছ নিষিদ্ধের” অপবাদ থেকে মুক্তির চেষ্টা করে যাচ্ছে।’

এতে বলা হয়—মাছ-প্রিয় বাঙালির সঙ্গে সখ্যতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির নেতারা প্রাণপণে চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া ‘বহিরাগত’ ও ‘নিরামিষভোজী’ তকমা থেকেও মুক্তি পেতে চান তারা।

এ ছাড়াও, ‘শুধু নিরামিষ’-এর দুর্নাম ঘোচাতে গত ২১ এপ্রিল বিজেপির এক নির্বাচনী প্রচারণায় মাছ খাওয়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়। বিজেপির সংসদ সদস্য অনুরাগ ঠাকুর সেই প্রচারণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বিজেপিকে ‘বাঙালির সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের’ জন্য হুমকি বলে প্রচার চালানো তৃণমূলের সাফল্য দেখা বিশ্লেষকদের অনেকে রসিকতা করে বলেছেন—‘অভ্যাস না থাকায় বিজেপির গলায় মাছের কাঁটা বিঁধেছে’। তাই ভোটের আগে সেই কাঁটা ছাড়াতে বিজেপি নেতারা মাছ নিয়ে এত ‘আদিখ্যেতা’ দেখাচ্ছেন।

এ কথা সবাই জানেন যে, আজ ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার ভোট হচ্ছে। দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল। ফল প্রকাশ ৪ মে।

তখন দেখা যাবে, আসলে মাছের কাঁটা কার গলায়, তৃণমূলের নাকি বিজেপির।