অনলাইন এক্সপোজ: সত্য প্রকাশ নাকি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল?
একজন অপরিচিত মানুষকে নিয়ে কারও একটি পোস্ট দেখলেন ফেসবুকে। সঙ্গে কয়েকটি স্ক্রিনশট কিংবা সেই ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও। আবার এমনও হতে পারে, কেউ লাইভে এসে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। মন্তব্যের ঘরে একটু নজর দিলেই দেখবেন, ওই পোস্টের ওপর ভিত্তি করে কেউ কেউ তাকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন। কেউ আবার বলছেন, অভিযুক্তের সবকিছু কেড়ে নেওয়া উচিত, তার কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন—এই ব্যক্তি দোষী। অথচ অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত, কাউকেই তারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। পুরো ঘটনা কী, তার কতটুকু সত্য, আর কতটুকু বাদ পড়ে গেছে—সেটিও তারা জানেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এই ‘এক্সপোজ’ সংস্কৃতি খুব পরিচিত একটি বিষয়। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আজকাল সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরা হয়। কখনো স্ক্রিনশট দিয়ে, কখনো ভিডিও বানিয়ে, কখনো দীর্ঘ পোস্ট লিখে। অনেক সময় এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। আবার অনেক সময় এমনও হয়, যেখানে পুরো ঘটনা জানার আগেই শুরু হয়ে যায় এক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল। অন্য পক্ষের বক্তব্য না জেনেই অভিযুক্তকে দোষী ধরে নেওয়া হয়, দোষারোপ করা শুরু হয়, হেনস্তা করা হয়।
সব ‘এক্সপোজ’ যে খারাপ, তা নয়
শুরুতেই একটি বিষয় স্বীকার করা প্রয়োজন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সামনে এসেছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা অন্য কোথাও কথা বলার সুযোগ পাননি, কিন্তু একটি পোস্টের মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে পেরেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সেই পোস্টের কারণেই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, আলোচনা হয়েছে, তদন্তও হয়েছে।
তাই ‘এক্সপোজ’ সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় বলা কঠিন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ‘এক্সপোজ’ অন্যদের সতর্ক করা বা ন্যায়বিচার চাওয়ার উপায় না হয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ এবং কারও সম্মানহানির হাতিয়ারে পরিণত হয়।
অভিযুক্তের কথা শোনার আগেই বিচার শুরু হয়ে যায়
সাধারণত যে ব্যক্তি আগে পোস্ট করেন, মানুষ প্রথমে তার কথাই শোনে। অন্য পক্ষ তখন হয়তো কিছু জানেই না কিংবা জানলেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেওয়ার সুযোগ পান না। কিন্তু ততক্ষণে মন্তব্যের ঘরে রায় প্রায় ঘোষণা হয়ে যায়।
অনেক সময় দেখা যায়, একটি পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর মানুষ অভিযুক্ত ব্যক্তির ডিজিটাল অতীত খুঁজতে শুরু করে। কয়েক বছর আগের ছবি, মন্তব্য বা ব্যক্তিগত তথ্যও সামনে আনা হয়। মূল অভিযোগের সঙ্গে সেগুলোর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, সেগুলো দিয়েই তার চরিত্রের বিচার শুরু হয়ে যায়। যেন একটি ঘটনার জবাব দিতে গিয়ে তাকে পুরো জীবনটিই ব্যাখ্যা করতে হবে।
কেউ চাকরিচ্যুত করার দাবি করেন, কেউ তাকে বয়কট করার আহ্বান জানান। আবার কেউ এমন ভাষায় আক্রমণ করেন, যার সঙ্গে মূল অভিযোগের কোনো সম্পর্কই নেই। অনেক সময় দেখা যায়, অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার চেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা করার প্রতিযোগিতাই যেন বেশি চলছে।
পরে যদি দেখা যায় ঘটনার আরও কিছু দিক ছিল কিংবা অভিযোগের কিছু অংশ ভুল ছিল, তখন সেই ব্যাখ্যা আর প্রথম পোস্টের মতো ছড়ায় না। প্রথম পোস্টটি হাজারো মানুষ দেখে, কিন্তু পরের ব্যাখ্যাটি অনেকের চোখেই পড়ে না। ফলে সত্যি যা-ই হোক, মানুষের মনে প্রথম ধারণাটিই থেকে যায়।
ব্যক্তিগত বিষয় থেকে জনসমক্ষে বিচার
ধরুন, রাফি আর মিতু নামের দুজন মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে গেল। রাগের মাথায় মিতু ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেন। সঙ্গে কিছু পুরোনো চ্যাটের স্ক্রিনশটও জুড়ে দিলেন, যেখানে রাফির কিছু কথা বেশ খারাপ দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই কথাগুলোর পেছনের প্রসঙ্গ বা পুরো কথোপকথন সেখানে নেই।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ল। মন্তব্যের ঘরে রাফিকে ‘প্রতারক’, ‘মিথ্যাবাদী’ কিংবা ‘মানসিক নির্যাতনকারী’ বলা শুরু হলো। কেউ তার প্রোফাইলে গিয়ে মন্তব্য করছেন, কেউ আবার তার কর্মস্থলকে ট্যাগ করছেন।
পরে হয়তো জানা গেল, সম্পর্কের গল্পটা এতটা সরল ছিল না। দুই পক্ষেরই ভুল ছিল, দুই পক্ষেরই বক্তব্য ছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনলাইনে রাফিকে ঘিরে একটি ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। আর মিতুও আসলে এতটা চাননি, রাগের মুহূর্তে করা একটি পোস্ট তার নিজের জীবনেও জটিলতা তৈরি করেছে।
অনলাইনে সব ‘এক্সপোজ’ জনস্বার্থে হয় না। কখনো বন্ধুত্ব ভাঙার গল্প, কখনো সম্পর্কের টানাপোড়েন, কখনো ব্যক্তিগত রাগ বা অভিমানও প্রকাশ্যে চলে আসে। দুইজন মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজারো মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে যায়।
সঙ্গে থাকে ব্যক্তিগত বার্তা, পুরোনো ছবি, ভয়েস রেকর্ডিং, এমনকি এমন কিছু কথোপকথনও, যা হয়তো কখনো জনসমক্ষে আসার জন্য বলা হয়নি। ফলে অনেক সময় বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ে—এটি কি সত্যিই মানুষকে সতর্ক করার জন্য করা হচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশের জন্য?
সমস্যা আরও বড় হয় যখন বিষয়টি দুইজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হঠাৎ করেই অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবার, সঙ্গী, ভাইবোন বা বন্ধুদের নামও আলোচনায় চলে আসে। কেউ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুঁজে বের করেন, কেউ ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেন, কেউ আবার তাদের কাছেও জবাবদিহি দাবি করেন।
অথচ অভিযোগ যেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হোক না কেন, তার পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সেই ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে শুরু হয়ে বিষয়টি ধীরে ধীরে আরও অনেক মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে প্রভাবিত করে।
ভুল প্রমাণিত হলেও সব ক্ষতি পুষিয়ে যায় না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরে সেটি ভুল প্রমাণিত হলেও সেই সংশোধন সাধারণত একই গতিতে ছড়ায় না। অনেক মানুষ প্রথম অভিযোগটি মনে রাখে, কিন্তু পরের ব্যাখ্যাটি আর মনে রাখে না।
ফলে একজন মানুষের সুনাম, সম্পর্ক, পেশাগত জীবন বা মানসিক অবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যেতে পারে। একটি পোস্ট হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে হারিয়ে যায়, কিন্তু সেই পোস্টের প্রভাব অনেক সময় থেকে যায় বছরের পর বছর।
তাহলে ‘এক্সপোজ’ সংস্কৃতি কতটা ন্যায্য?
এর উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা জরুরি। মানুষের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার অধিকারও আছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে একটি পোস্ট সবসময় পুরো গল্প বলে না। জবাবদিহি আর সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল এক বিষয় নয়। একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ তৈরি করে, অন্যটি অনেক সময় সত্য জানার আগেই রায় দিয়ে দেয়। তাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্য জানার চেষ্টা করছি, নাকি শুধু দ্রুত বিচার করতে চাইছি?