‘কালো সোনা’য় জ্বালানি সংকটের সমাধান দেখছে ভারত
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে ভারতের বহু এলাকায় রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে মানুষকে। তবে উত্তর প্রদেশের নেকপুর গ্রামের গৌরী দেবীর জন্য এই সংকট তেমন কোনো সমস্যা নয়।
নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে নিজের উঠানের রান্নাঘরে নীল শিখার চুলায় রুটি সেঁকছিলেন ২৫ বছর বয়সী গৌরী। সেই চুলার জ্বালানি আসে গরুর গোবর থেকে তৈরি বায়োগ্যাস থেকে—যা এখন এলপিজির বিকল্প হিসেবে অনেকের নজর কাড়ছে।
গৌরী বলেন, ‘এতে সবকিছু রান্না করা যায়। কখনো চাপ কমে গেলে আধা ঘণ্টা রেখে দিলে আবার ঠিকমতো কাজ করে।’
বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, ভারতে বছরে তিন কোটি টনের বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার হয়, যার অর্ধেকের বেশি আমদানি করতে হয়। সরকার গ্যাসের ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও সরবরাহে বিলম্ব, আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা ও কালোবাজারির কারণে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
তবে ১৯৮০-এর দশক থেকেই গ্রামীণ জ্বালানির সস্তা উৎস হিসেবে বায়োগ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে আসছে ভারত সরকার। এ পর্যন্ত পাঁচ মিলিয়নের বেশি ‘ডাইজেস্টার’ ইউনিটে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, যেখানে কৃষিজ বর্জ্য থেকে রান্নার জন্য মিথেন গ্যাস এবং সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ তরল তৈরি হয়।
গৌরীর বাড়িতে প্রতিদিন কয়েক বালতি গোবর পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাটির নিচে গাড়ির আকারের একটি ট্যাংকে ঢালা হয়। সেখান থেকে উৎপন্ন গ্যাস পাইপের মাধ্যমে রান্নাঘরে পৌঁছে যায়। জরুরি পরিস্থিতি বা বড় অনুষ্ঠানের বাইরে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারই করতে হয় না তাকে।
তিনি বলেন, ‘সবই রান্না করা যায়—সবজি, চা, ডাল।’
বায়োগ্যাস তৈরির পর যে তরল অবশিষ্ট থাকে, তা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃষকদের মতে, কাঁচা গোবরের তুলনায় এতে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন বেশি সহজলভ্য হয়।
কৃষক প্রমোদ সিং ২০২৫ সালে বড় একটি ইউনিট স্থাপন করেছেন, যা ছয়জনের পরিবারের জন্য যথেষ্ট। তার চারটি গরু থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ কেজি গোবর পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধজনিত বাণিজ্য বিঘ্নে কৃত্রিম সারের বৈশ্বিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই জৈব সার এখন আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে।’
স্থানীয় কৃষকনেতা প্রীতম সিং বলেন, ‘আসল লাভ শুধু গ্যাস নয়, সেটি যেন বোনাস। এই তরল সারই আসল “কালো সোনা”।’
ভারতের ১৪০ কোটির বেশি মানুষের ৪৫ শতাংশেরও বেশি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গবাদিপশুর সংখ্যা রয়েছে। একইসঙ্গে এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি দূষণকারী দেশ।
২০৭০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে ভারত সরকার বৃহৎ পরিসরে বায়োগ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত বছর সরকার নির্দেশ দিয়েছে, যানবাহন ও গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত তরল গ্যাসের অন্তত এক শতাংশ বায়োগ্যাস হতে হবে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে কোটি কোটি ডলারের বহু বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ছোট গ্রামীণ ইউনিটও বাড়ানো হচ্ছে। এসব ইউনিটের দাম প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার রুপি, যার বড় অংশে সরকারি ভর্তুকি থাকে।
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে গরুকে পবিত্র মনে করা হয়। গোবর ও গোমূত্র মেঝে লেপন, জ্বালানি ও ধর্মীয় আচারসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে বায়োগ্যাসের পক্ষে জনসমর্থন পাওয়া তুলনামূলক সহজ বলে জানান প্রীতম সিং।
তিনি ২০০৭ সালে নিজের প্রথম প্ল্যান্ট স্থাপন করেন। গত এক বছরেই তার গ্রামের আরও ১৫টি প্ল্যান্ট স্থাপনে সহায়তা করেছেন তিনি।
প্রীতম সিং বলেন, ‘আগে যারা আগ্রহ দেখাত না, এখন তারাই জানতে চায় কীভাবে এটি পাওয়া যায়। রান্না আর ফসলের উপকার দেখলেই মানুষ রাজি হয়ে যায়।’
তবে এখনো গৃহস্থালির রান্নার জ্বালানির খুব ছোট একটি অংশই বায়োগ্যাস থেকে আসে। কারণ এলপিজিকে তুলনামূলক বেশি সুবিধাজনক মনে করা হয়।
ইন্ডিয়ান বায়োগ্যাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ আর শুক্লা বলেন, ‘বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি ছোট একটি কারখানা। এর জন্য সঠিক স্থাপন, নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।’
তার মতে, সমবায় বা কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বেশিরভাগ পরিবারই বায়োগ্যাসকে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবেই দেখবে।
সরকারি সহায়তা থাকা সত্ত্বেও খরচ ও জায়গার অভাবও বড় বাধা। মাদলপুর গ্রামে এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য প্রায় ১০০ জনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর রমেশ কুমার সিং বলেন, ‘সারাদিন অন্যের খেতে কাজ করি। নিজের জমিই নেই, প্ল্যান্ট বসাব কোথায়?’
৭৭ বছর বয়সী মাহেন্দ্রী টানা তিন দিন চেষ্টা করেও গ্যাসের সিলিন্ডার পাননি। প্রচণ্ড গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি।’