যুদ্ধ থামাতে অস্থায়ী চুক্তির পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, যা আছে খসড়ায়
যুদ্ধ বন্ধে সীমিত পরিসরে অস্থায়ী চুক্তির দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। চুক্তির খসড়া কাঠামো অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ হলেও দুই দেশের মধ্যে বিতর্কিত বিষয়গুলো আপাতত অমীমাংসিতই থাকছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাতে আজ বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত খসড়াটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির বদলে স্বল্পমেয়াদী সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এতে দুইপক্ষের গভীর মতপার্থক্য স্পষ্ট এবং এটি যে কেবল অন্তর্বর্তীকালীন উদ্যোগ, সেটিও বোঝা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আংশিক চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে বিশ্ববাজারে তার বড় প্রভাব পড়বে।
কেন অন্তর্বর্তী সমাধান
রয়টার্স জানায়, তেহরান ও ওয়াশিংটন আপাতত বড় ধরনের সমঝোতার লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও কতদিন ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে, এসব বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
ফলে উভয়পক্ষই অস্থায়ী উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছে। এর লক্ষ্য হবে নতুন করে যুদ্ধ ঠেকানো এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
মধ্যস্থতায় যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার হলো, তারা যেন স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষের ঘোষণা দেয়। এরপর বাকি বিষয়গুলো সরাসরি আলোচনায় সমাধান হতে পারে।’
যা আছে খসড়া চুক্তিতে
অস্থায়ী এই চুক্তির মূল লক্ষ্য দুইটি। প্রথমত, পুনরায় যুদ্ধ শুরু না করা এবং দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা।
সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, প্রস্তাবিত কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা, এরপর হরমুজ সংকট নিরসন এবং পরে বিস্তৃত চুক্তির জন্য ৩০ দিনের আলোচনা শুরু।
যেসব বিষয় আপাতত বাদ
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উল্লেখ নেই।
এর মধ্যে রয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধের বিষয়টি।
ইরানের কাছে থাকা প্রায় অস্ত্রমানের ৪০০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়েও খসড়ায় স্পষ্ট কিছু নেই। যদিও এটি ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় বলে দাবি করা হয়েছে বারবার এবং এটাকেই কারণ দেখিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
আশাবাদী ট্রাম্প, সন্দিহান ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়, এটা খুবই সম্ভব।’
পরে তিনি সবকিছু দ্রুত শেষ হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে ইরান এ প্রস্তাব নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, তেহরান যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক জবাব দেবে।
ইরানের সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই এ প্রস্তাবকে ‘বাস্তবতার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার তালিকা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো’ ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি ইঙ্গিত দেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ব্যর্থ হওয়ার পর এ সমঝোতার বিষয়টি প্রচার করছে যুক্তরাষ্ট্র। একে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
তেলের দাম কমেছে
সম্ভাব্য চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় তিন শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৯৮ ডলার হয়েছে।
একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতিও দেখা গেছে এবং বন্ডের সুদহার কমেছে।
টোকিওভিত্তিক স্বাধীন বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘জিসিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর সিনিয়র কর্মকর্তা তাকামাসা ইকেদা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রস্তাবের বিষয়বস্তু এখনো সীমিত। তবে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে, আর বড় ধরনের সামরিক অভিযান নাও হতে পারে।’