জিতলো কে?
একটি যুদ্ধে সব পক্ষই যখন নিজেদের বিজয় দাবি করে তখন সাধারণভাবেই সর্বসাধারণ মনে প্রশ্ন জাগে—আসলে, জিতলো কে? একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ কি বিবদমান সব পক্ষকেই বিজয়ী করতে পারে? নাকি, আসল সত্য সবার কাছ থেকে সচেতনভাবেই সরিয়ে রাখা হচ্ছে?
তিন মাসের বেশি সময় যুদ্ধ চালিয়ে বা যুদ্ধের ১০৬ তম দিনে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরকার নিজেদের ‘সাফল্য’ নিজ নিজ দেশের জনগণ তথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে।
যদিও সমঝোতায় কী আছে তা কোনো পক্ষই পরিষ্কার করে বলছে না, যদিও কিছু বিষয় নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা আছে বলে মন্তব্য করা হচ্ছে; তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন—অন্তত কূটনৈতিকভাবে ইরানের ‘বিজয়’ হয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরাজয়ের’ ইঙ্গিত।
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইসরায়েল ও লেবানন এই ‘যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সমঝোতা’ থেকে কী পেল?—এমন আলোচনাও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয়।
এদিকে, আপাত শান্তির বাতাসে চাঙ্গা হচ্ছে বিশ্ববাণিজ্য। উন্নত দেশে পুঁজিবাজারের সূচকগুলোকে দেখা যাচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। সারাবিশ্বে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো ট্রাম্প-তেহরান সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফেলেছেন স্বস্তির নিঃশ্বাস।
এমন পরিস্থিতিতেও অনেকে আশঙ্কা করে বলছেন—‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি!’
হোয়াইট হাউস বা ডাউনিং স্ট্রিট বা ব্রাসেলস থেকে ইরান নিয়ে ইতিবাচক বার্তা আসলেও, খোদ মার্কিন রাষ্ট্রপতির খাস রিপাবলিকান পার্টির অনেকের সঙ্গে প্রধান মিত্র তেল আবিব থেকেও আসছে হতাশার সুর। যদিও ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ভক্তদের অনেকে বলছেন—এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে ইরানকে ‘বাগে’ আনা গেছে।
তবে এই দুই নেতার বিরোধীদের অনেকের বক্তব্য: এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে ‘এক ঘাটে বাঘে-মোষে পানি খাওয়ার’ নজির তৈরি হয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক নজিরবিহীন বাস্তবতার দিকে পরিচালিত করবে।
যে যাই বলুক না কেন, খনিজসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষণিকের শান্তিও যে কতটা প্রত্যাশার জন্ম দিতে পারে তা নিয়ে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার অন্ত নেই। তাহলে শান্তিই কি প্রকৃত বিজয়ী?
ইরানের সময়ে ১৫ জুন ও যুক্তরাষ্ট্রের সময়ে ১৪ জুন দুই দেশের নেতাদের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া বহুল আলোচিত সমঝোতাপত্রটি আজ বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে জি–৭–এর শীর্ষ সম্মেলনের এক ফাঁকে সই হয়েছে।
এতে সই করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসানে সই করা সমঝোতা স্মারকের একটি কপি হাতে ধরে আছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: এএফপি
ইরান: অধরা শান্তি?
জেনেভায় শান্তি আলোচনা প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ও অপ্রত্যাশিত হামলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইরান। গত ১৫ জুন দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের এক সংবাদের শিরোনামে জানানো হয়, ‘সমঝোতায় পৌঁছানো গেলেও শান্তিতে পৌঁছানো গেল কি? তা এখনো অনিশ্চিত।’
প্রতিবেদন অনুসারে—ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াইয়ে ইরানের কূটনৈতিক বিজয় হয়েছে। তার ভাষ্য: ইরানি জাতি দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত চাহিদার বিপরীতে কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছে।
‘ইসরায়েলের হতাশা ইরানি জাতির সাফল্য ও বিজয়ের সুস্পষ্ট লক্ষণ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে তাহলে অনেক আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নতুন বাস্তবতা দেখা দেবে।
একইদিনে, ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিপরীতে ইরানের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রশংসা করে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে ইরান ‘চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে গর্বের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে’।
তার ভাষ্য: ‘আমরা দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে আছি এবং আল্লাহর রহমতে যুদ্ধ শেষে আমাদের ইরান বিজয়ী হবে।’
সমাজমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে তিনি এমন বার্তার সঙ্গে মধ্য ইরানের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বছর পুরোনো আবারকুহ সাইপ্রাস গাছের ছবি জুড়ে দিয়ে যেন ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতার জানান দেন।
গত ১৬ জুন ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (ইরনা) দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামির এক বক্তব্য প্রচার করে। এই শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘শত্রু বাহিনী ইরানের উপকূলের দিকে এগোনোর দুঃসাহস পর্যন্ত দেখাতে পারেনি।’
তার বক্তব্য: ‘এই যুদ্ধে শত্রুরা আগ্রাসন চালিয়েছিল। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে আমাদের রক্ষা করেছি। যদিও আমরা চরম আগ্রাসনের শিকার হয়েছিলাম, তবুও আমরা আমাদের রক্ষা করতে পেরেছি।’
‘শত্রুরা সব ধরনের অপরাধ করলেও তাদের কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এক ইঞ্চি জমিও তারা দখল করতে পারেনি।’
সেনাপ্রধান হাতামি মনে করেন—শত্রুদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরাজয় হয়েছে এবং ইরান বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র: গুড ব্যাড আগলি?
ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছিল। এই যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের যুদ্ধ না করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘিত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টির পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনিদের বিরক্তি বেড়েছে।
যে দেশের শাসকদের হটাতে গিয়ে যুদ্ধের শুরু সেই দেশের শাসকদের প্রশংসা করে যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা দেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত ১৬ জুন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের বর্তমান শাসকরা আগের শাসকদের তুলনায় ‘অনেক বেশি যৌক্তিক’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুগপৎ হামলায় ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প মনে করছেন—যেসব নেতা ‘অবিবেচক’ ছিলেন তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তেহরানের তুলনায় ওয়াশিংটন ডিসি বেশি আগ্রহী ছিল—এমনটাই বলে আসছিলেন পশ্চিমের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৬ জুন সিএনএনের এক বিশ্লেষণে প্রশ্ন রাখা হয়—ইরানের সঙ্গে সমঝোতা ভালো, না মন্দ, নাকি দুটোই?
এতে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় কী আছে তা যতটা না জানা যাচ্ছে এর চেয়ে বেশি জানা যাচ্ছে এই সমঝোতা সংক্রান্ত মন্তব্য।
কেননা, সমঝোতাপত্রটি এখনো কেউ দেখেননি। বিবদমান কোন পক্ষ কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাও সুস্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে না। সেসব প্রতিশ্রুতি কীভাবে ও কখন বাস্তবায়ন করা হবে তা স্পষ্ট নয়।
যতটুকু তথ্য সামনে আসছে সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে নানা ধরনের মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। কারও কাছে এই সমঝোতার শর্তগুলো রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের পক্ষে নাও যেতে পারে।
এমনটি হলে প্রশ্ন জাগে—তাহলে ট্রাম্প কেন এমন সমঝোতা করলেন?
কারও কারও মতে, এটি হচ্ছে ‘সর্বসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে সেরা বিকল্প’।
একইদিনে সংবাদমাধ্যমটি অপর এক প্রতিবেদনে জানা যায়—ইরানের কাছে ট্রাম্প আত্মসমর্পণ করেছেন, এমন আশঙ্কা রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতাদের অনেকের।
গত ১৪ জুন সাউথ ক্যারোলিনার সিনেটর রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী নেতা লিন্ডসে গ্রাহাম এক এক্স বার্তায় ‘সময় কথা বলবে’ বলেও মন্তব্য করেন।
তার মতে, ইরান যেভাবে চুক্তির বিষয়বস্তু তুলে ধরছে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মিলছে না।
চূড়ান্ত চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে তোলা হলে এর বিচার-বিশ্লেষণ সঠিকভাবে করা যাবে বলেও বার্তায় লিখেন তিনি।
গত ১৬ জুন ফক্স নিউজ জানায়—ফ্রান্সে শিল্পোন্নত ৭ দেশের সম্মেলনে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন যে পারস্য উপসাগরীয় দেশটি যদি পরমাণু অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে তাকে ‘চরম পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
যদিও ইরান বহু দশক ধরেই বলে আসছে যে তারা কখনোই পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে চায় না। শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য তারা পরমাণু গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প ‘ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক’ বজায় রাখার আশাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
একইদিনে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ট্রাম্প বলেছেন যে ‘আমাদের ইরান চুক্তি পৃথিবীতে অনেক সাফল্য বয়ে আনবে’।
গত ১৫ জুন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক মতামতে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সকে ইরান সমঝোতার ‘কারিগর’ ও ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবেও মন্তব্য করা হয়।
গত তিন মাসে ট্রাম্প যে ‘অন্তত ৩৮ বার’ শান্তি ‘ঘরের দরজায়’ বলেছেন, সে কথাও মতামতটিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। তবে এতে ‘বাঘ এলো’-র গল্প উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে বেশ খোঁচাও দেওয়া হয়।
গত ১৩ জুন লন্ডনের কিংস কলেজের ভিজিটিং প্রফেসর ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাইকেল ক্লার্ক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে জানান—ইরান সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপমান’ করেছে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানিরা তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারকেও অপমান করেছিল। এবার ট্রাম্পকে তারা অপমান করলো।
ইসরায়েল: ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল?
গত ১৬ জুন বিশ্লেষকরা ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরকে বলেন যে, ইরান যুদ্ধ ‘ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত বিপর্যয়’ ডেকে এনেছে।
কিন্তু, এর একদিন আগে দ্য জেরুসালেম পোস্টের এক বিশ্লেষণে ট্রাম্প-তেহরান সমঝোতাকে আখেরে ইসরায়েলের জন্য সুখকর হবে বলে মন্তব্য করা হয়।
বিশ্লেষণটিতে বলা হয়—ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ইসরায়েল তথা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের যে উদ্বেগ আছে তা এই সমঝোতার মাধ্যমে দূর হবে।
এর মাধ্যমে এমনকি, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
ইসরায়েলে আশার পাশাপাশি অনেকে হতাশা প্রকাশ করলেও সেখানে নানান দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ভালো-মন্দ দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
দেশটির কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেছেন যে, এই সমঝোতা মানতে ইসরায়েল বাধ্য নয়। আবার সেখানকার বিরোধী দলগুলো এই সমঝোতাকে সরকারের ‘পুরোপুরি ব্যর্থতা’ বলে ভোটের মাঠে প্রচার চালাতে শুরু করেছে।
একইদিনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে জানা যায়—দেশটির বিরোধীদলপ্রধান ইয়ার লাপিদ কৌশল করে বলেছেন, ‘যুদ্ধে ইসরায়েল রাষ্ট্র জিতেছে; হেরেছেন নেতানিয়াহু।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী লক্ষ্য পূরণ করেছে বলেও মনে করছেন তিনি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে ইসরায়েলের ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে কংগ্রেস ও নেসেট সদস্যদের যে আলোচনা বেশ কয়েক বছর ধরে চলছিল, ট্রাম্প-তেহরান সমঝোতার কারণে তা আরও জোরালো হয়ে সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেছেন, ‘ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অধীন নয়। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ নতুন সমঝোতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে যা মেলে না আমরা তার অংশ না।’
গত ১৫ জুন দ্য জেরুসালেম পোস্টের অপর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেছেন, ‘ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তনের পর (অর্থাৎ, নেতানিয়াহুর সরকারের পতনের পর) ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ শুরু হবে।’
তার এমন বক্তব্যে মোটা দাগে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, ইরানে ইসরায়েলি হামলা এখনো শেষ হয়নি। অনেক বিশ্লেষকের মতে—ইরান ও এর মিত্রদের ক্ষেত্রে যে ‘মোয়িং দ্য গ্রাস’ বা ‘বাগানের বড় হয়ে যাওয়া ঘাস ছেঁটে দেওয়া’-নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তা একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, এই সমঝোতা ইসরায়েলকে আরও বেশি ‘স্বাধীন’ ও ‘সক্ষম’ করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সমঝোতায় লেবানন প্রসঙ্গ থাকলেও তেল আবিব তা মানছে না। দেশটির এমন আচরণ এর স্বাধীন সমরনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হয়ে উঠছে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়।
তেল আবিবের আচরণের ওপর যদি ট্রাম্প-তেহরান সমঝোতা নির্ভর করে তাহলে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে ছড়ি ঘোরানোর ক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে কিনা বা দেশটি প্রতিবেশীদের কাছে আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে কিনা তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
যারা এই সমঝোতাকে ইসরায়েলের জন্য ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যতের’ ইঙ্গিতবাহী মনে করছেন, তাদের ভাবনা একেবারে অমূলক নাও হতে পারে।
লেবানন: আশা-নিরাশার দোলাচল
গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩ হাজার ৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৫০০ জন। এমন বাস্তবতায় লেবাননে যুদ্ধ থামলে তা সেই দেশের জনগণের জন্য স্বস্তির কারণ হবে—এমনটিই আশা করা স্বাভাবিক।
কিন্তু, দেখা যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় লেবানন দুলেছে আশা-নিরাশার দোলাচলে। দেশটির রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন এই সমঝোতাকে স্বাগত জানালেও বিরোধীদের অনেকে দিচ্ছেন ভিন্ন মত।
‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা লেবাননের জন্য কী বার্তা বহন করে?—শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
গত ১৫ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, লেবাননের সঙ্গে শান্তির বিষয়ে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
হিজবুল্লাহকে অস্ত্রমুক্ত দেখতে চাওয়া লেবাননের মানুষগুলো ঠিক নিশ্চিত না—যে সশস্ত্র সংগঠনটির কারণে তাদের দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে—সেই সংগঠনটিকে আদৌ নিরস্ত্র করা যাবে কিনা।
এমনকি, অনেকের আশঙ্কা এই সমঝোতার মাধ্যমে ইরান যেমন আরও শক্তিশালী হয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে তেমনি হিজবুল্লাহ হয়ত আরও শক্তিশালী হয়ে লেবাননের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ, লেবানন হিজবুল্লাহকে নিয়ে যে তিমিরে ছিল তা কেটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তাই অনেকে এই সমঝোতাকে ‘মেরোরেন্ডাম অব মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বলেও মন্তব্য করছেন।
গত ১৫ জুন আল জাজিরা এক লেবাননী আইনপ্রণেতার বরাত দিয়ে জানায়, এই সমঝোতা লেবাননের জন্য ‘চরম খারাপ’ হয়েছে। লেবাননের পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র সদস্য পলা ইয়াকুবিয়ান সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘হিজবুল্লাহ ইরানের জন্য লড়াই করে। লেবাননের জন্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, লেবানন যেমন চায় না ইসরায়েল তাদের ভূমি দখল করে রাখুক; অন্যদিকে, তারা এটাও চায় না যে ইরান তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করুক।
অথচ, এই সমঝোতার মাধ্যমে লেবানন ও হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব আরও বাড়বে বলে মত দেন তিনি।
কেউ জিতেনি?
গত ১৬ জুন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগের অবস্থায় বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্যের ধরন, জ্বালানি বাজার, এমনকি জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তারকারীরাও বদলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সবাই কাজ করছে।
শীর্ষ জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশগুলো বিকল্প খুঁজতে গিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি পরমাণু ও কয়লাভিত্তিক জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
এদিকে, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক স্কট লুকাস মনে করেন—বোমার চেয়ে যেকোনো সমঝোতা উত্তম।
তার মতে, ‘আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো যুদ্ধেই কেউ জেতেনি। মাঝখান থেকে মানুষ মরেছে। তাদের দুঃখকষ্ট বেড়েছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ইরানের সরকারবিরোধী প্রধানমুখ দেশটির সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি ট্রাম্প-তেহরান সমঝোতার নিন্দা করেছেন। তার আশঙ্কা, এই সমঝোতা তেহরানের বর্তমান শাসকদেরকেই শক্তিশালী করবে।
গত ১৭ জুন বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—ইরান এই সমঝোতাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয় হিসেবে প্রচার চালালেও এই যুদ্ধবিরতি ইরানিদের জন্য খুবই জরুরি।
এতে বলা হয়—যুদ্ধ, অবরোধ ও মূল্যস্ফীতির কারণে ইরানের সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। তাদের কাছে এই সমঝোতা কোনো বিজয় বয়ে আনছে কিনা তা বড় বিষয় নয়। তাদের আশা, এর মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম কমবে। আরেকটি অপ্রত্যাশিত যুদ্ধের ভয় থেকে মুক্তি মিলবে।
তবে এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে ইরানের কট্টরপন্থি শাসকরা যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মতো রিপাবলিকান পার্টির কাছেও যে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই।
আর এসব কারণেই কি পৃথিবীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরে ইরান যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে কোনো গণজমায়েত দেখা গেল না? পাশাপাশি, এই প্রশ্নটিও থেকে গেল—প্রকৃত অর্থেই এই যুদ্ধে জিতলো কে?




