তীব্র গরমে পুড়ছে ইউরোপ, ফ্রান্সে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু
ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে, সেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুন মাসের দিন ও রাতের রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী-খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে নামতে গিয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ১৮ জুন থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ডুবে মারা গেছেন অন্তত ৪০ জন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ।
তিনি এই ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘তাপপ্রবাহের সময় অনিরাপদ জলাশয়ে নামার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।’
ফ্রান্সের ক্রীড়া ও যুবমন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই শীতল হওয়ার উপায় খুঁজছে, কিন্তু অনেকেই নদী, খাল কিংবা পর্যবেক্ষণবিহীন সাঁতারস্থলে নামার ঝুঁকি বিবেচনায় নিচ্ছেন না।’
তিনি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
নিহতদের মধ্যে রয়েছে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, যে রোববার সন্ধ্যায় পরিবারের সঙ্গে প্যারিসের দক্ষিণে ফন্তেন-লা-পোর এলাকায় সেন নদীতে গোসল করতে নেমেছিল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মেয়েটি সাঁতার জানত না।
এ ছাড়া, লিওনের কাছে রোন নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে এক তরুণ পেশাদার ফুটবলার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নিষিদ্ধ এলাকায় নদীতে নামার পর চার তরুণ বিপদে পড়লে উদ্ধারকর্মীরা অভিযান চালায়।
এদিকে চরম গরমের কারণে ফ্রান্সে আরও দুটি শিশুমৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কারপঁত্রা শহরে পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির ভেতর থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা, অতিরিক্ত তাপদাহে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার ছিল ১৯৪৭ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ দিন। জাতীয় তাপমাত্রা সূচক ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ২০০৩ ও ২০১৯ সালের তাপপ্রবাহের সময়কার পূর্ববর্তী রেকর্ড ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রিকে ছাড়িয়ে গেছে।
দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। বোর্দো শহরে রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অনেক শহরে বছরের যেকোনো সময়ের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে।
শুধু দিন নয়, সোমবার রাতও ছিল ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ রাত। ওই রাতে দেশের সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
প্রচণ্ড গরমের কারণে ফ্রান্সের ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৫৪টিতে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার এই সংখ্যা বেড়ে ৫৮-তে পৌঁছাবে। দেশটির প্রায় অর্ধেক অঞ্চল বর্তমানে ‘অসহনীয় ও ক্লান্তিকর’ তাপপ্রবাহের মধ্যে রয়েছে।
তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সের অন্যতম প্রতীকী স্থাপনা আইফেল টাওয়ার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় টাওয়ারটি বন্ধ করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় আট ঘণ্টা আগে। বুধবারও একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীসমৃদ্ধ জাদুঘর লুভরও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন দুই ঘণ্টা আগে জাদুঘরটি বন্ধ থাকবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঐতিহাসিক ভবনটি আংশিকভাবে গরম সহনশীল হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চরম তাপমাত্রার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়ানোর মতো অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। দিনের শেষভাগে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে ভবনের ভেতরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়।
প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলের প্রশাসন নাগরিকদের যতটা সম্ভব বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ট্রেন ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
অঞ্চলটির প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি পেক্রেস বলেন, ‘অত্যধিক গরমে রেল অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেললাইনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গণপরিবহনে বিঘ্ন ঘটতে পারে।’
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গলফেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রটির একটি রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কারণ শীতলীকরণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত নদীর পানির তাপমাত্রা নিরাপদ সীমা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেনেও তাপপ্রবাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটির প্রায় পুরো ভূখণ্ডই তাপমাত্রা সতর্কতার আওতায় রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের আন্দালুসিয়া, উত্তরাঞ্চলের কান্তাব্রিয়া ও বাস্ক অঞ্চলে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় আবহাওয়া সংস্থা অ্যামেট জানিয়েছে, কর্দোবা শহরের আশপাশে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এব্রো উপত্যকায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে। সোমবার দেশটির ৮২৮টি আবহাওয়া কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টিতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আন্দুজার এলাকায় সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।
আবহাওয়াবিদ রুবেন দেল কাম্পো বলেন, ‘গত কয়েক দশকের তুলনায় এখন গ্রীষ্মের শুরুতেই তাপপ্রবাহের ঘটনা অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে স্পেনে জুন মাসে ১০টি বড় তাপপ্রবাহ রেকর্ড হয়েছে, যেখানে এর আগের ২৫ বছরে এমন ঘটনা ছিল মাত্র দুটি।’
ইতালিতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন ও ভেনিসসহ ১৫টি শহরে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতা শুধু বৃদ্ধ বা অসুস্থদের জন্য নয়, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
অতিরিক্ত গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মিলান ও তুরিনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। পারমা শহরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত তিন দিনে শুধু তাপজনিত সমস্যার কারণে এক হাজারের বেশি মানুষ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জার্মানিতেও তাপপ্রবাহের কারণে সাঁতার দুর্ঘটনা বেড়েছে। দেশটির লাইফসেভিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে রোববারের মধ্যে অন্তত ছয়টি প্রাণঘাতী সাঁতার দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে অনেক পুরুষ সাঁতারু নিজেদের সক্ষমতা অতিরিক্ত মূল্যায়ন করায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
রাইন নদীতে নিখোঁজ তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে উঠে আসা বিশাল উষ্ণ বায়ুর স্তর ইউরোপজুড়ে এই তাপপ্রবাহের প্রধান কারণ।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানী ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ‘এই উষ্ণ বায়ু অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে বাতাসের প্রবাহ কমে গেছে এবং স্বস্তি দেওয়ার মতো ঠান্ডা হাওয়া প্রায় নেই বললেই চলে।’
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্ব এখন জলবায়ু সংকটের কারণে আরও বিপজ্জনক তাপমাত্রা ও সম্ভাব্য বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। অনেক স্থানে আরও নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।