ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে মৃত ২৬৪৫, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৫ জনে। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬০০ জনের বেশি। সরকারি সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখনও অন্তত ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপি ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল এবং রাজধানী কারাকাসের আশপাশে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য বহুতল ভবন ধসে পড়েছে, ভেঙে গেছে সড়ক ও অবকাঠামো। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশায় দিনরাত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা।

ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের কারাবালেদার তানাগুয়ারেনা এলাকায় ধসে পড়া ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর দৃশ্য। ছবি: এএফপি

গত ২৪ জুন এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে আঘাত হানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এরপর কেটে গেছে এক সপ্তাহের বেশি সময়। কিন্তু ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে সেই বিভীষিকার স্মৃতি এখনও তাজা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির সরকার ১০ হাজার মরদেহ রাখার ব্যাগ সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ড্রোনচিত্র। ছবি: রয়টার্স

ধ্বংসস্তূপে পরিণত লা গুয়াইরা

ক্যারিবীয় উপকূলবর্তী লা গুয়াইরা শহর এখন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। বহু বহুতল আবাসিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে পচনশীল মরদেহের দুর্গন্ধ, আর আকাশে চক্কর কাটছে শকুন।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ। কেউ অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার আশা করছেন, কেউ অন্তত প্রিয়জনের মরদেহটি খুঁজে পেয়ে দাফনের সুযোগ চান।

নিজেদের ঘরে ফিরতে না পারায় হাজার হাজার মানুষ এখন পার্ক, উন্মুক্ত মাঠ ও জনচত্বরে অস্থায়ী তাঁবু গেড়ে বসবাস করছেন।

কারাকাসের পারকে দেল এস্তে পার্কে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শিবিরে নিজের তাঁবুর ভেতরে বসে আছেন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত রিনেরি পেরেইরা। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

‘জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়ংকর কয়েক সেকেন্ড’

লা গুয়াইরার ৫৮ বছর বয়সী পডিয়াট্রিস্ট রিনেরি পেরেইরা আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ কয়েক সেকেন্ড ছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটির পর একটি ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। এমন শব্দ আমি আগে কখনও শুনিনি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব প্রতিবেশী, যাদের আমরা চিনতাম, মারা গেছেন। ফোন হাতে নিলেই জানতে পারছি কোনো পুরোনো পরিচিত বা দীর্ঘদিনের গ্রাহক আর বেঁচে নেই।’

তার অভিযোগ, স্থানীয় মানুষকে সাহায্য করেছে স্বেচ্ছাসেবক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি দূতাবাসগুলো, কিন্তু সরকারের কোনো সহায়তা তারা পাননি।

ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরায় ধসে পড়া সেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দিকে তাকিয়ে আছেন ডেলিন আরিয়াস, যেখানে সর্বশেষ তার সঙ্গীকে দেখা গিয়েছিল। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

ধ্বংসস্তূপের সামনে স্বামীর অপেক্ষায়

৩৬ বছর বয়সী ডেলিন আরিয়াস এখনও তার স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় আছেন। ভূমিকম্পের সময় তার স্বামী ক্লাসে ছিলেন। তিনি মনে করেন, ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার সময়েই ভবনটি ধসে পড়ে।

ডেলিন বলেন, ‘সেদিন বিকেল ৪টা ৫৭ মিনিটে তিনি বলেছিলেন, আমার ক্লাস আছে, একটু পরে ফোন দেবো। কিন্তু এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা, ৭টা বেজে গেল—তখনই বুঝলাম, ভূমিকম্পের সময় তিনি হয়তো ভবনের ভেতরেই ছিলেন।’

‘এখনও আমরা তাকে খুঁজে পাইনি। আরও বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ,’ বলেন তিনি।

কারাকাসের পারকে দেল এস্তে পার্কে অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে একটি তাঁবু ভাগাভাগি করে থাকছেন ফ্রান্সিস আলেক্সান্ডার গোমেজ ও তার ছেলে। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হওয়ায় প্রাণে বাঁচলেন বাবা-ছেলে

৪৯ বছর বয়সী স্ট্রিটফুড বিক্রেতা ফ্রান্সিস আলেক্সান্ডার গোমেজ ও তার ছেলে এখন কারাকাসের পারকে দেল এস্তে পার্কে অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে আমরা বাসায় ছিলাম না। কুকুরগুলোকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছিলাম। পুরো ভবনটি মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে।’

পরদিন তারা একটি পরিত্যক্ত গাড়িতে রাত কাটান। পরে হেঁটে হেঁটে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছান।

‘এখানে আমাদের খাবার, পোশাক আর একটি তাঁবু দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আমাদের সাহায্য করছে। কিন্তু নিজের সরকার কিছুই করছে না। সবকিছু দুর্নীতির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে,’ অভিযোগ করেন তিনি।

ভয়াবহ ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত হয়ে ছেলে সন্তানকে নিয়ে কারাকাসের পারকে দেল এস্তে পার্কের অস্থায়ী তাঁবু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ভিক্টোরিয়া রোবাইনা। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

‘ছেলের মনে এখনও ভূমিকম্পের আতঙ্ক’

৩০ বছর বয়সী রেস্তোরাঁকর্মী ভিক্টোরিয়া রোবাইনা বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি সমুদ্রসৈকতে ছিলেন।

‘আমাদের চোখের সামনে একের পর এক ভবন ধসে পড়ছিল। অসংখ্য মানুষ মারা গেছে। আমরা কখনও ভাবিনি এমন একটি ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হবো,’ বলেন তিনি।

তার ছোট ছেলে এখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ‘রাত হলেই সে সেই ভয়াবহ মুহূর্তগুলো আবার মনে করে। তখন আমাকে তাকে শান্ত করতে হয়,’ বলেন ভিক্টোরিয়া।

চার দিন বিদ্যুৎহীন থাকার কথাও জানান তিনি। লা গুয়াইরায় এখনও পানির সংকট চলছে। দুর্গন্ধ ও মরদেহের কারণে অনেকেই সেখানে ফিরতে পারছেন না।

কারাকাসের পারকে দেল এস্তে পার্কে অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থানকালে নিজের পোষা বিড়াল লিয়াকে জড়িয়ে ধরেছেন লুজমিদলা আরেচেদেরা। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

পোষা প্রাণীর খোঁজে তিন দিন

কারাকাসের ৫৭ বছর বয়সী হেয়ারড্রেসার লুজমিদলা আরেচেদেরা বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি ভেবেছিলেন পরিবারের কেউই বাঁচবে না।

পরে বাসায় ফিরে দেখেন, তাদের দুটি পোষা বিড়ালের একটি নিখোঁজ।

‘তিন দিন ধরে আমরা খুঁজেছি। শেষ পর্যন্ত লিয়া নামের একটি বিড়ালকে ফিরে পেয়েছি। আমরা ডাক দিতেই সে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আসে। কিন্তু আরেকটি এখনও নিখোঁজ,’ বলেন তিনি।

ভূমিকম্পের পর থেকে আহত ও অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন প্যারামেডিক উইলিস মাদ্রিদ। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে

স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ

কারাকাসের প্যারামেডিক উইলিস মাদ্রিদ জানান, ভূমিকম্পের পর রোগীদের পরিবহন ও চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘অনেক রোগীর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ পুরোনো অসুস্থতা আরও জটিল হয়ে গেছে। শুরুতে পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল, যদিও এখন কিছুটা স্থিতিশীল,’ বলেন তিনি।

তার মতে, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর।

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বহু মানুষ এখনও ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ছবি: এএফপি

সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, নিম্নমানের সরকারি আবাসন নির্মাণ এবং নিরাপত্তা মান উপেক্ষার কারণেই এত বড় প্রাণহানি ঘটেছে।

অনেকের দাবি, বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা এলেও তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না।

তবে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব ছিল কিনা—এমন অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

এদিকে উদ্ধারকারীরা এখনও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি ঘণ্টা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও, হাজারো পরিবার এখনও অলৌকিক কোনো প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে।