কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৪১
কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সোমবার সকালে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৪১ জনে দাঁড়িয়েছে।
ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে। এসব ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়েছেন।
আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
কলম্বিয়ার উদ্ধারকারীরা গতকাল মঙ্গলবার একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় এক ৩২ বছর বয়সী নারীকে উদ্ধার করেন। এ সময় উপস্থিত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে।
এখনো জীবিতদের খোঁজে অভিযান অব্যাহত আছে।
দানিয়েলা লার্গোকে নীল কম্বলে জড়িয়ে ধ্বংসস্তুপ থেকে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। উদ্ধার অভিযানে সেনা, দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের জনবিরল প্রদেশ চোকোর সান হোসে দেল পালমারের কাছে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০৭ কিলোমিটার।
এখন পর্যন্ত এই ভূমিকম্পে ২৪১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন এক হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ।
দানিয়েলার মা মা সান্দ্রা মিলেনা পেরেজ বলেন, ‘আমরা আশা হারিয়ে ফেলছিলাম। এরই মধ্যে আমরা একটি ফোনকল পাই।’
পেরেজ বলেন, স্থানীয় এক বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার শুনে প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করেন।
অল্প সময়ের মধ্যে পেশাদার উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দেন।
পেরেইরা ও কালি শহরে জরুরি উদ্ধারকারী দল ক্রেন, কুকুর ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধসে পড়া ভবনগুলোতে তল্লাশি চালায়। অন্যদিকে, ধসে পড়া স্থাপনার নিচে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছানোর আশায় স্বেচ্ছাসেবকেরা হাতে হাতে ধ্বংসাবশেষ সরানোর জন্য ছোট ছোট দল গঠন করেন।
অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলো পার্কে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন অনুভূত হচ্ছিল।
ভূমিকম্পে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটাই লাতিন আমেরিকার দেশটিতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা।
আকাশ থেকে নেওয়া ছবিতে দেখা গেছে কালির বিভিন্ন এলাকার স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। যেখানে আগে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়িঘর ছিল, সেখানে এখন শুধু ভেঙে পড়া নির্মাণ সামগ্রী দেখা যাচ্ছে।
কাছেই ধসে পড়া দেয়াল ও কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে গাড়িগুলো দুমড়েমুচড়ে পড়ে ছিল।
একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর এক তরুণ দম্পতি নিজেদের জিনিসপত্র খুঁজতে ভাঙা ইট-কংক্রিটের ওপর দিয়ে উঠছিলেন।
তারা একটি শিশুর উজ্জ্বল লাল রঙের বিছানার পাশের টেবিলের ভেতর থেকে একটি বাক্স উদ্ধার করেন।
অনেক বেঁচে যাওয়া মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। কারও বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আবার কেউ আবারও ভূমিকম্প আঘাত হানার ভয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেননি।
পেরেইরার একটি পার্ক তাঁবু ও গদি দিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রুপান্তর করা হয়।
আশ্রয়কেন্দ্রে স্ত্রী ও সাত মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন জন তাবাসকো (২৩)। তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু বেঁচে আছি’।
‘এর আগে কখনো আমাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি, অন্য কারও সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তা অবিশ্বাস্য’, যোগ করেন তিনি ।
অন্যরা কয়েক দশকের পরিশ্রমে গড়ে তোলা বাড়ি হারানোর বাস্তবতা মেনে নিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।
কালিতে ভূমিকম্পের সময় হসপিতাল ইউনিভার্সিতারিও দেল ভায়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে চিকিৎসকেরা রোগীদের একটি পার্কিং এলাকায় সরিয়ে নিতে এবং কয়েকজনকে খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হন।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে অনেক কলম্বিয়ান সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন।
হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যান। একই সময়ে রক্তদান কেন্দ্রগুলোর বাইরে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
‘নিজের সম্প্রদায়, শহর ও দেশের মানুষকে সাহায্য করতে চাওয়ার বিষয় এটি,’, বলেন রক্তদাতা ফেরনি কাবরেরা।
মঙ্গলবার পেরেইরা সফরের সময় প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বাড়িভাড়ায় ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও সহায়তার প্রস্তাব ও সমর্থনের বার্তা এসেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন অব্যাহত থাকলেও উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে যেতে থাকে।
তাদের আশা, সেখান থেকে হয়তো আরও মানুষের কণ্ঠ, ধাক্কার শব্দ বা শিসের আওয়াজ শোনা যেতে পারে।
