ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নয়, তেলের দাম কমানোই লক্ষ্য: জেডি ভ্যান্স

স্টার অনলাইন ডেস্ক

তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা এখন আর ইরান যুদ্ধে প্রাধান্যের বিষয় নয়। বরং মার্কিন ভোক্তাদের জন্য তেলের দাম কমিয়ে আনাই এখন ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।

এমনটাই বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

আজ শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্য করেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বেসেন্ট জানান, শিগগির তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন ‘অর্থনৈতিক শাস্তি’ আরোপ করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল

হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে চলমান যুদ্ধে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা আদায় করে নিতে পেরেছে ইরান। ভ্যান্স ও বেসেন্টের মন্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।

এতদিন পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর গলায় বলে এসেছেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কেড়ে দেওয়াই এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। কিন্তু দুই শীর্ষ মার্কিন নেতার গতকালের বক্তব্যে প্রাধান্যের বিষয়টি বদলে গেছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে তেল পরিবহন নিশ্চিত করাই এখন প্রাধান্যের বিষয়।

ভ্যান্সের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধটি এখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ হামলার মুখে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান।

দরকষাকষির টেবিলে ইরানকে বিশেষ সুবিধা এনে দিয়েছে এই উদ্যোগ।

সাম্প্রতিক সময়ে হন্যে হয়ে ইরান যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। মনস্তাত্ত্বিক বিজয় অর্জন করে মার্কিন জনগণকে খুশি রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলকেও তুষ্ট করার দ্বৈত লক্ষ্য পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা নিয়ে আলোচনারই সুযোগ পাননি ট্রাম্প।

নিজ দেশের জনগণের কাছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছেন ট্রাম্প। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে তার জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছে গেছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এবং এর পেছনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে ইরান যুদ্ধ—যা বেশিরভাগ মার্কিনিদের কাছে অপ্রয়োজনীয় ও অজনপ্রিয়।

ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের গাড়িতে ও বাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

রিপাবলিকান পার্টির নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের আশঙ্কা, এই অসন্তোষই দলের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। হাতছাড়া হতে পারে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ।

ফক্স নিউজকে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি জানি, আজ তেলের দাম কমেছে এবং সংঘাতের শুরুর দিকের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এখন তা অনেক কম।’

‘এটাই আমাদের প্রথম লক্ষ্য—দেশজুড়ে আমেরিকানদের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম কমিয়ে আনা’, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর অবশ্যই দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করা।’

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সই সবচেয়ে বড় সমালোচক।

ট্রাম্পের ধীরে চল নীতি

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান প্রসঙ্গে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থানে থাকতে চাচ্ছেন ট্রাম্প। ভ্যান্সের এই মন্তব্যেও এর ইঙ্গিত মিলেছে। সরাসরি হামলার বদলে তিনি ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ রেখে ‘ধীরে চলার’ নীতি অব্যাহত রাখতে চাইছেন।

ট্রাম্পের আশা, এই অবরোধের ফলে বহির্বিশ্বে তেল রপ্তানি করতে না পেরে ইরানের অর্থনীতিতে ধস নামবে।

ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপের হুমকি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট।

তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।’

মাত্র কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি আসন্ন।

এখন তার প্রশাসন নিজেদের অবস্থানে আরও অনড় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা স্থগিত রেখে ট্রাম্প আশা করছেন, অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে।

ট্রাম্প জেন জি প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় শব্দাংশ ‘লো কি’ ব্যবহার করে বলেন, ‘আমরা বিষয়টা লো-কি রেখেছি (এটা নিয়ে খুব বেশি শোরগোল তৈরি করছি না)। ইরানের সঙ্গে দরকষাকষিকেও খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছি না আমরা। আমরা মূলত ইরানকে পর্যবেক্ষণ করছি। তারা ব্যাপক মূল্যস্ফীতিতে আক্রান্ত এবং তাদের কাছে কোনো অর্থ নেই বললেই চলে।’

সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে তিনি এসব কথা বলেন।

ট্রাম্পের হাতে বিকল্প কমে আসছে

যুদ্ধ শুরুর পর গত কয়েক মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এখন এসব অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে বলে জানা গেছে, যা ইরানে আবার হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বিকল্পগুলো সীমিত করে দিচ্ছে।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা জ্বালানির ওপর এই যুদ্ধের প্রভাবকেই বেশি প্রাধান্য দিই। কারণ আমরা চাই মার্কিন জনগণের জন্য তেল-গ্যাসের খরচ সহনীয় পর্যায়ে থাকে। আবার অন্যান্য সময়ে আমরা স্পষ্টতই সামরিক লক্ষ্যের দিকে বেশি নজর দিই—তাদের পরমাণু কর্মসূচি (বন্ধ করা) প্রাধান্য পায় তখন।’

ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছিলেন, দ্রুত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হলে তবেই তিনি ইরানে আবার হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবেন।

এখন প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ছাড় দেওয়া এবং যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ।

এসব শর্ত জুনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলোরই প্রতিফলন।

যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ায় ওই সমঝোতা ভেস্তে যায়। এতে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের প্রস্তাবও ছিল।

সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, ট্রাম্পের হাতে বিকল্পের সংখ্যা কমে আসছে। বড় আকারে সামরিক অভিযান বা অর্থনৈতিক চাপ—কোনোটাই ইরানকে নতজানু করতে পারছে না। আবার ইরানের সব শর্ত মেনে চুক্তিতেই সই দিতে চাইছেন না তিনি।