প্রেসিডেন্ট থেকে পোপ: হত্যাচেষ্টা এড়ানোর অভিনব যত ঘটনা
ঘটনাটি যেন বাস্তবের নয়, রুপালি পর্দার কোনো দৃশ্য। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে হামলার হুমকিতে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন গোয়েন্দারা সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করার পর তাকে দ্রুত নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ধারণা করা হয়েছিল, হুমকিটির সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র থাকতে পারে।
যেভাবে হত্যাচেষ্টা এড়ান ট্রাম্প
হুমকি নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় নজিরবিহীন এক নিরাপত্তা অভিযান। ট্রাম্পকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে গোপনে বের করে অন্য একটি সরকারি উড়োজাহাজে নেওয়া হয়।
সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় ছিল, এয়ার ফোর্স ওয়ানে তখনও ট্রাম্পের সহযোগী, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ শতাধিক মানুষ ছিলেন। তাদের অধিকাংশই জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট আর ওই উড়োজাহাজে নেই।
এয়ার ফোর্স ওয়ান যথারীতি যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করে। আর ট্রাম্পকে বহনকারী ছোট সি-৩২এ উড়োজাহাজটিও নিরাপদে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করতে মূল উড়োজাহাজটিকেই এক ধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে এর আগেও কি এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে?
উত্তর হলো, হ্যাঁ।
তবে প্রতিটি ঘটনার কৌশল ছিল আলাদা। কোথাও শেষ মুহূর্তে উড়োজাহাজ বদলানো হয়েছে, কোথাও গন্তব্য গোপন রাখা হয়েছে, কোথাও বুলেটের মধ্য দিয়ে গাড়ি ছুটেছে, আবার কোথাও বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ড আগে নিরাপত্তাকর্মীরা নেতাকে সরিয়ে নিয়েছেন।
পাকিস্তান যাওয়ার পথে উড়োজাহাজ বদলেছিলেন বিল ক্লিনটন
২০০০ সালে ভারত ও পাকিস্তান সফরে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। মুম্বাই থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল তার।
তবে এর এক বছর আগেই পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সফরটি ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল।
শেষ পর্যন্ত ক্লিনটন সরাসরি এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে ইসলামাবাদ যাননি। একটি বড় সি-১৭ উড়োজাহাজকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে তাকে অন্য পাশে রাখা একটি ছোট, চিহ্নহীন সাদা উড়োজাহাজে নেওয়া হয়। ওই উড়োজাহাজেই ইসলামাবাদে পৌঁছান তিনি।
গোপন পথে পালিয়ে বাঁচেন পোপ ক্লেমেন্ট সপ্তম
১৫২৭ সালে রোমে হামলা চালিয়ে শহরে ঢুকে পড়ে রোমান সম্রাট পঞ্চম চার্লসের বাহিনী। সে সময় ভ্যাটিকানে থাকা পোপ ক্লেমেন্ট সপ্তমকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যবহার করা হয় একটি গোপন পথ।
ভ্যাটিকান থেকে কাস্তেল সান্ত'আঞ্জেলো দুর্গ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মিটার দীর্ঘ ‘পাসেত্তো দি বর্গো’ নামের উঁচু পথটি জরুরি পরিস্থিতিতে পোপকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
হামলাকারীরা রোমে ঢুকে পড়ার পর ক্লেমেন্ট সপ্তমকে দ্রুত ওই পথ দিয়ে দুর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। পোপকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় তার নিরাপত্তায় থাকা সুইস গার্ডের সদস্যরা হামলাকারীদের ঠেকিয়ে রাখেন। ১৮৯ জন সুইস গার্ডের মধ্যে ১৪৭ জন সেদিন নিহত হন। তাদের প্রতিরোধের সুযোগেই পোপ নিরাপদে দুর্গে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
কাস্তেল সান্ত'আঞ্জেলোতে কয়েক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর ক্লেমেন্ট সপ্তম শেষ পর্যন্ত মুক্তির বিনিময়ে অর্থ দিতে সম্মত হন। পরে তিনি রোম ছেড়ে ওরভিয়েতোতে আশ্রয় নেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, পোপকে বাঁচাতে কোনো পাল্টা আক্রমণ নয়, বরং একটি গোপন পথই হয়ে উঠেছিল তার পালানোর রাস্তা।
প্রায় পাঁচ শতাব্দী পর তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাতেও দেখা যায় একই ধরনের কৌশল—বিপদের মুহূর্তে শীর্ষ নেতাকে এমন একটি পথে সরিয়ে নেওয়া, যার কথা সম্ভাব্য হামলাকারীরা জানে না।
জর্জ ডব্লিউ বুশের গোপন বাগদাদ সফর
২০০৩ সালে থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের টেক্সাসের ক্রফোর্ডের খামারে থাকার কথা ছিল। হোয়াইট হাউস সেসময় তার নৈশভোজের মেনুও প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু বুশ তখন সেখানে ছিলেন না। তিনি গোপনে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে যান।
সেখানে পৌঁছে বুশ অন্য একটি উড়োজাহাজে ওঠেন। ওই ফ্লাইটের সব আলো বন্ধ রাখা হয়, জানালার পর্দা টেনে দেওয়া হয় এবং সেটি বাগদাদের উদ্দেশে রওনা হয়।
বুশের এই সফরের কথা আগে থেকেই ১৩ সদস্যের একটি ছোট প্রেস পুলকে জানানো হয়েছিল।
বুশ বাগদাদের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সেনাদের সঙ্গে সময় কাটান। এয়ার ফোর্স ওয়ান নিরাপদ উচ্চতায় পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের খবরটি প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়।
সরাসরি হত্যার হুমকি না থাকলেও যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ রাখতেই এই সফরে গোপনীয়তা ও বিভ্রান্তির কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের তুরস্কের ঘটনা কেন আলাদা
বিভিন্ন কারণেই তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি আলাদা।
এখানে নিরাপত্তা কৌশলটি শুধু প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করতে প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, শতাধিক মানুষকে নিয়ে একটি উড়োজাহাজ গন্তব্যের দিকে যাত্রা করছিল—যেন মনে হয় প্রেসিডেন্টও সেটিতেই আছেন। অথচ ট্রাম্প ততক্ষণে অন্য একটি উড়োজাহাজে নিরাপদে সরে গেছেন।
প্রায় ৫০০ বছর আগে পোপ ক্লেমেন্ট সপ্তমকে বাঁচিয়েছিল একটি গোপন পথ। ২০২৬ সালে ট্রাম্পকে নিরাপদে সরাতে ব্যবহার করা হলো ক্যাটারিং ট্রাক, বিকল্প উড়োজাহাজ এবং একটি ‘ডিকয়’ এয়ার ফোর্স ওয়ান।
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষকে বিপদের মুহূর্তে অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশলটি বদলায়নি।