কয়েক মাসের মধ্যেই খাদ্যসংকটে পড়তে পারে ব্রিটেন: টেলিগ্রাফ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

খরা, ফসলহানি, গবাদিপশুর মৃত্যু ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই খাদ্যসংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ব্রিটেন। কৃষকদের সংগঠনগুলো বলছে, আগামী বছরের ফসল উৎপাদনের জন্য এখনই সরকারি সহায়তা না পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৪ সালের পর এবারই ফসলের উৎপাদন সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। একই সময়ে গবাদিপশুর মৃত্যুও বেড়েছে। ফলে অনেক কৃষকের কাছেই আগামী বছরের ফসল চাষের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই।

শুক্রবার একাধিক কৃষি সংগঠন জানায়, তারা এখন ‘সংকটের পর্যায়ে’ রয়েছেন এবং সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করছেন।

ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের (এনএফইউ) সভাপতি টম ব্র্যাডশ টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘কৃষকেরা নগদ অর্থের প্রবাহ ও আত্মবিশ্বাস, দুই দিক থেকেই সংকটের মধ্যে রয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি অনেক দেরিতে আসায় ফসলের উৎপাদন কমে গেছে। অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরাও দেশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ব্লুটাং রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছেন।’

হার্টফোর্ডশায়ারে কৃষিকাজ করা ব্র্যাডশ আরও বলেন, ‘আগামী বছরের ফসলের বীজ বোনা কিংবা গবাদিপশু পালনের মতো পর্যপ্ত অর্থ থাকবে না ভেবে অনেকেই উদ্বিগ্ন।’

Image
EUROPE-WEATHER-BRITAIN
ব্রিটেনের অ্যান্ডোভারের কাছে খরায় শুকিয়ে যাওয়া মাঠের মাঝে একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ড্রোনে ধারণ করা দৃশ্য। ৪ আগস্ট, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

টেলিগ্রাফ জানায়, ব্রিটেনে সাধারণত শরৎকালে গম ও যবের মতো ফসলের বীজ বোনার পর গ্রীষ্মে তোলা হয়। কিন্তু এবার সার ও ডিজেলের দাম ছিল অনেক বেশি। আবার সদ্য সংগ্রহ করা দুর্বল ফসলের কারণে শস্যের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি টন সারের দাম ৪৬০ পাউন্ড। এই সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করা হয়। ইরানে যুদ্ধের কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় দাম বেড়েছে।

টেলিগ্রাফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সাল থেকে ব্রিটেনে ফসল উৎপাদনের রেকর্ড রাখা হয়। এরপর থেকে চলতি বছরের ফসল উৎপাদন সবচেয়ে খারাপ হয়েছে।

এ বছর যব, ওটস ও তেলবীজের উৎপাদন মাত্র ১ কোটি ৯৫ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তীব্র গরম ও খরার কারণে আলু ও গাজরের উৎপাদনও স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটেনের চেলমসফোর্ডের গ্রেট ওয়ালথামের হামফ্রিস ফার্মে সবুজ চারণভূমিতে অ্যাবারডিন অ্যাঙ্গাস গরু নিয়ে যাচ্ছেন খামারি স্যাম স্কুইয়ার। পুনর্জননশীল কৃষিপদ্ধতিতে খামারটি খরার সঙ্গে আরও সহনশীল হয়ে উঠেছে। ১১ আগস্ট, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

সাম্প্রতিক রেকর্ড তাপপ্রবাহেও গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্লুটাং রোগ এ বছর বিশেষভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই রোগের কারণের ভেড়ার প্রজননক্ষমতায় সমস্যা থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত হয়। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়াও তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত ব্লুটাং রোগে ৫০০টির বেশি আক্রান্তের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার বেশির ভাগই ইংল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে।

এনএফইউসহ আরও কয়েকটি কৃষি সংগঠন খরার কারণে হওয়া ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের কাছে সুদমুক্ত ঋণের আর্জি জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী বছরের খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন পাবে।

মৃত ভেড়াগুলোকে সৎকার করার খরচ বহনেও কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছে সংগঠনগুলো।

গ্রামীণ জমি মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী কান্ট্রি ল্যান্ড অ্যান্ড বিজনেস গ্রুপের সভাপতি গ্যাভিন লেন টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এই গ্রীষ্মের খরা, ব্লুটাং এবং ইরানের চলমান পরিস্থিতির সম্মিলিত চাপে কৃষিখাতে তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হয়েছে।’

ব্রিটেনের লন্ডনে একটি দোকানের বাইরে সাজানো ফল ও সবজি। ১৮ আগস্ট, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

গত বছর লেবার সরকারের পারিবারিক খামারের ওপর করের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আয়োজন করা ক্লাইভ বেইলি বলেন, ‘খরার কারণে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সবচেয়ে কম ফলন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘লোকসান হবে জেনেও কৃষকেরা আগামী বছরের জন্য ফসল চাষ করছেন। একইসঙ্গে এখনো প্রতিটি পারিবারিক খামারের ওপর ঝুলে আছে উত্তরাধিকার কর।’

‘ব্রিটিশ কৃষকেরা এর আগেও চরম আবহাওয়া মোকাবিলা করেছেন। কিন্তু এর সঙ্গে এমন প্রতিকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কখনো মোকাবিলা করতে হয়নি,’ বলেন তিনি।

সরকারের এক মুখপাত্র টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, আমরা এখনই কৃষিখাতকে সহায়তা করতে কাজ করছি। খরার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কৃষকদের সহায়তার জন্য গত সপ্তাহে ৬ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই কঠিন সময়টা আমরা বুঝতে পারছি এবং কৃষকদের কথা শুনছি। ব্রিটিশ কৃষিকে এগিয়ে নিতে আমরা কৃষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাব।’