নেপালে বন্যা: সতর্কবার্তা কতটা কাজে এসেছে? কতটুকু সময় ছিল নিরাপদ স্থানে যাওয়ার

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বুধবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিট। নেপালের চার জেলার নদীতীরবর্তী মানুষের মোবাইলে একের পর এক সতর্কবার্তা পৌঁছাতে শুরু করল। বার্তায় বলা হয়—তিব্বতের দিক থেকে ভয়াবহ বন্যার স্রোত ভোতেকোশি নদীতে প্রবেশ করেছে, নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে সবাইকে।

সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমুণ্ডু পোস্টে প্রকাশিত নেপালের সেন্টার অব হাইড্রোলজি অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চের ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ২ ঘণ্টার কম সময়ে সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে মালেখুর একটি সেতু বন্যার স্রোতে ভেসে যায়।

দুপুর ১টার মধ্যে সেই স্রোত মুগলিন পার হয়ে দেবঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বন্যার পানি পৌঁছে যায় নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায়।

তিব্বত থেকে নেমে আসা সেই বন্যার স্রোত প্রায় ১০ ঘণ্টায় ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে নারায়ণী নদী পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো—নেপালের আগাম সতর্কবার্তা কি মানুষকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট সময় দিয়েছিল?

নেপালে সতর্কবার্তা দেওয়া হয় যে যে সময়ে। ছবি: এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

এ নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমুণ্ডু পোস্ট, বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও এএফপিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বরাতে রয়টার্স জানায়, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপালের রাসুয়া জেলায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। প্রথমে একে ভূমিকম্প মনে করা হলেও কিছুক্ষণ পরই জানা যায়, এটি আসলে বরফ-পাথরের ধস ও স্রোতে সৃষ্ট কম্পন।

প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত সীমান্তের কাছে পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। বরফ-পাথরের সেই ধস লেন্দে খোলা নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে পানি, বরফ, পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে আসে।

এরপর শুরু হয় বন্যার পানির প্রায় ১০ ঘণ্টার এক ভয়ংকর যাত্রা।

ভূমিধস ও বন্যার বার্তা

ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্প রেকর্ড করার প্রায় ১৩ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রাসুয়ার স্যাব্রুবেশি এলাকার পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে তথ্য আসা বন্ধ হয়ে যায়।

সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্রটির সর্বশেষ রেকর্ডে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১ দশমিক ৬২ মিটার।

ওই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সতর্কতা স্তর ছিল ৬ মিটার এবং বিপৎসীমা ৯ মিটার।

এর প্রায় ১৫ মিনিট পর কর্তৃপক্ষ খবর পায়, তিব্বতের দিক থেকে বড় ধরনের বন্যার স্রোত নদীতে প্রবেশ করেছে।

তবে এর আগেই রাসুয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিমুরে এলাকায় পানি প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো এগিয়ে আসে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাজারের বড় অংশ ভেসে যায়।

উপরের অংশে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোও একে একে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে পানি বাড়ার সতর্ক সংকেত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

সতর্কবার্তা

ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বত থেকে বন্যার স্রোত ভোতেকোশিতে ঢোকার খবর পাওয়ার প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে, সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের মধ্যে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।

সব মিলিয়ে ৬ লাখের বেশি এসএমএস পাঠায় তারা।

বন্যার গতিপথ অনুসরণ করে আরও অন্তত দুই দফায় সতর্কবার্তা পাঠায় কর্তৃপক্ষ।

ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বার্তা সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটে পাঠানো হয়। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রথম দফায় ৬ লাখের বেশি এসএমএস দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়।

দ্বিতীয় বার্তা দেওয়া হয় সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে। ধাদিংয়ের গালছি এলাকা, পৃথ্বী মহাসড়ক, মুগলিন–নারায়ণঘাট সড়ক এবং ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী মানুষকে নতুন করে সতর্ক করা হয়।

তৃতীয় বার্তা দেওয়া হয় দুপুর ১টায়। বন্যার স্রোত মুগলিন পার হওয়ার পর দেবঘাট পর্যন্ত নদীতীরবর্তী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।

কতটা সময় পেয়েছে মানুষ?

প্রতিবেদনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর জন্য মানুষের হাতে নির্দিষ্ট কত সময় ছিল, তা বলা হয়নি। কারণ নদীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পৌঁছেছে বিভিন্ন সময়ে।

তবে সময়ের হিসাবটি দেখলে স্রোতের গতি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তিব্বত থেকে বন্যার স্রোত ভোতেকোশিতে ঢুকে পড়ার খবর আসে।

সকাল ১১টা ২৬ মিনিটে মালেখু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়।

মাত্র ১৭ মিনিট পর, সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে, বন্যার স্রোতে ফুরকে নদীর সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ভেসে যায়।

১১টা ৫০ মিনিটের মধ্যে পানি মালেখু এলাকায় পৌঁছে যায়।

অর্থ হচ্ছে, তিব্বত থেকে স্রোত আসার খবর পাওয়ার প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের মধ্যে মালেখু এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

তবে মালেখুর এলাকার সব বাসিন্দা ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট সময় পেয়েছিলেন, এমনটা বলা যাবে না। কারণ সতর্কবার্তা পৌঁছানো, বার্তাটি দেখা, পরিস্থিতি বোঝা এবং নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সময়—সবকিছুই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এরপর দুপুর ১টার দিকে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়, বন্যার স্রোত মুগলিন অতিক্রম করেছে। এ সময় দেবঘাট পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।

দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে নারায়ণী-দেবঘাট এলাকায় পৌঁছে যায় বন্যার স্রোত। বিকেল ৪টার পর থেকে দেবঘাটে পানি কমতে শুরু করে। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে দেবঘাটে পানির উচ্চতা প্রায় ৪ মিটারে নেমে আসে।

প্রাথমিক প্রযুক্তিগত হিসাবে, এই বন্যার সঙ্গে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার পানি যুক্ত হয়েছিল।

সীমাবদ্ধতা

ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগাম সতর্কবার্তা অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রেখেছিল।

তবে এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। এর মধ্যে, বন্যার উৎসের কাছাকাছি থাকা স্বয়ংক্রিয় পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো নিজেরাই স্রোতে ভেসে যায়।

ফ্লাড ফোরকাস্টিং ডিভিশনের কর্মকর্তা বিনোদ পরাজুলি কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, ‘কোনো স্টেশনই স্বাভাবিক নিয়মে সতর্ক সংকেত পাঠাতে পারেনি। বন্যা এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে স্টেশনগুলো সতর্কতা পাঠানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।’

নেপালের রাসুয়ার তিমুরে ও আশপাশের এলাকার মানুষের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বন্যার স্রোত এত আকস্মিক ও শক্তিশালী ছিল যে অনেক মানুষ সতর্ক হওয়ার সুযোগই পাননি।

নিউজিল্যান্ডের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা জিএনএস সায়েন্সের প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স রয়টার্সকে বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ স্রোতে পরিণত হতে পারে। আর একবার সেই স্রোত নদী ধরে নেমে এলে তার গতি ও শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিচু এলাকার মানুষের পক্ষে সরে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন।’

রয়টার্স জানিয়েছে, এ বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫০ জনের বশি মানুষ মারা গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছে আরও এক হাজারের বেশি।

এএফপি জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের নদীতে একটি বাধা এখনো রয়ে যাওয়ায় আরেক দফা বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।