যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই কোর্স ঢেলে সাজাবে চীন
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য ‘এআই মূলনীতি ও ব্যবহারিক চর্চা’ কোর্স ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের সামরিক গবেষকরা।
চীনের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের রোববারের প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।
সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আধুনিক যুগের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করাই এর মূল লক্ষ্য।
ভবিষ্যৎ সামরিক কর্মকর্তাদের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) যুদ্ধের’ জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করতে এই কোর্সে যুদ্ধ পরিস্থিতির অনুশীলন যুক্ত করা হবে।
চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনইউডিটি) বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের গবেষকরা চীনের সামরিক শিল্পবিষয়ক সাময়িকী ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি কনভার্শান-এর জুলাই সংস্করণে তাদের এই প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
এমন সময় এই প্রস্তাব এলো যখন চীন সেনা সদস্যদের ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে।
এসব উদ্যোগের কেন্দ্রে আছে সেনাদের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত দক্ষতা বাড়ানো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী এখন যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও অভিযানে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। যার ফলে, সেনাদের প্রশিক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেনাদের প্রশিক্ষিত করে তোলাই চীনের মূল লক্ষ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা যাতে প্রতিপক্ষের তুলনায় কোনো অবস্থাতেই পিছিয়ে না থাকে—এটাই নিশ্চিত করতে চায় শি জিনপিং-এর সরকার।
গবেষকরা মত দেন, এখন যেসব এআই কোর্স চালু আছে, সেগুলোতে সেনাদের কাজে লাগবে, এমন কিছু নেই বললেই চলে। ‘যুদ্ধের জন্য শিক্ষা’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহারিক প্রয়োগে সহায়তা করতে এই কোর্সগুলোকে ঢেলে সাজানো দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০২২ সালে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূলনীতি ও চর্চা’ নামের একটি কর্স চালু করে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ের শিক্ষার্থীদের এআই সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য এই কোর্স চালু করা হয়। পাশাপাশি এআই নিয়ে বিশেষায়িত কোর্স ও ডিগ্রিও চালু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।
গবেষকদের মত, শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ বিষয়ের পড়াশোনার সঙ্গে এআইকে সমন্বিত করা ও একটি উদীয়মান প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো বিষয়গুলো এই কোর্সে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় গবেষকরা কোর্সটি ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
কোর্সে একটি মানবহীন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রমে এআই কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা শেখানো হবে।
এই মানবহীন সামরিক অভিযানের বিভিন্ন অংশে কীভাবে এআইকে কাজে লাগানো যায়, সেটাই শিখবেন শিক্ষার্থীরা।
গবেষকদের প্রস্তাব মতে, আধুনিক যুগের জটিল ও সূক্ষ সামরিক অভিযানের বিভিন্ন পর্যায় উঠে আসবে এই কোর্সে।
এর মধ্যে থাকবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পদক্ষেপ গ্রহণ; লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, এর অবস্থান নির্ধারণ ও অনুসরণ করা, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং সব শেষে, ফলাফল মূল্যায়ন।
উদাহরণ হিসেবে, ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’ এর কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।
সেখানে এআই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে নতুন জ্ঞান অর্জন করে—অর্থাৎ, এটি ভুল থেকে শিক্ষা নেয়।
এই কোর্সে ওয়ার গেমিং ও কমব্যাট ডিসিশান মেকিংয়ের মতো অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত করতে চান গবেষকরা।
অপরদিকে অপর্যাপ্ত বা নির্ভরযোগ্য নয় এমন তথ্যের ভিত্তিতে এআই কোনো সিদ্ধান্ত নিলে যুদ্ধক্ষেত্রে মারাত্মক বিপদ নেমে আসতে পারে—এ বিষয়টিও শ্রেণিকক্ষের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শিক্ষার্থীদের শেখাতে চান গবেষকরা।
গবেষক দলটি একটি অনলাইন সিমুলেশন প্ল্যাটফর্মও তৈরি করেছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা মানচিত্র ও পরিস্থিতি তৈরি করতে, বাহিনী ও মিশনের বিন্যাস নির্ধারণ করতে এবং কৃত্রিম যুদ্ধ অনুশীলনের মাধ্যমে এআই এজেন্টকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। এর মাধ্যমে রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং সম্পর্কে তাদের ধারণা আরও গভীর হবে।
এই প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন শিক্ষার্থী দলের প্রশিক্ষিত এআই এজেন্ট পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
এনইউডিটি চীনের সামরিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। এটি চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
২০১৫ সালে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়টি চীনের পরমাণু প্রকল্পের সুপারকম্পিউটারে অননুমোদিত মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
